ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন কার্যক্রম। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে গ্যাসনির্ভর ৯৯টি কারখানার উৎপাদন গড়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরের মধ্যেই অন্তত ২০টি কারখানা শ্রমিকদের ছুটি দিতে বাধ্য হয়।
শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে মোট ২৯৩টি কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৯৯টি সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এই কারখানাগুলোর প্রায় সবকটিতেই সংকটের প্রভাব পড়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ বা জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে মেশিন চালু রাখলেও বিকল্প ব্যবস্থায় পূর্ণ উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে স্পিনিং ও টেক্সটাইল খাত। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসে মোট ৫০টি মেশিনের মধ্যে মাত্র সাতটি সচল রয়েছে, বাকি ৪৩টি বন্ধ। ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলসের ৩০টি মেশিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সে উৎপাদন কমেছে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ৪০ শতাংশ মেশিন চালানো যাচ্ছে না। সিরামিক খাতের এক্সিলেন্ট সিরামিকসের ফার্নেস বন্ধ থাকায় সেখানে উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।
ময়মনসিংহ শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ কাঞ্জিলাল জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই গ্যাসের চাপ কমতে থাকে। সাধারণত বিকেল পর্যন্ত উৎপাদন চললেও পরিস্থিতির কারণে দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যেই মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেড, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল ও বিএসপি স্পিনিং মিলসহ ২০টি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের ছুটি দেয়।
কারখানা কর্মকর্তাদের মতে, এই সমস্যা কেবল একদিনের নয়, বেশ কিছুদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ভালুকার গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের ইউটিলিটি বিভাগের ব্যবস্থাপক সোহেল আহাম্মেদ জানান, "প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক নেই। কারখানার জন্য ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও মিলছে ১১ থেকে ১২ পিএসআই। এতে উৎপাদন কমেছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ।"
গ্যাস সরবরাহের এই সংকট স্বীকার করেছেন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) শামীম হোসেন। তিনি বলেন, "ভালুকা এলাকায় ১৪০ ও ৫০ পিএসআইয়ের দুটি লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে তারা ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছেন।" তার ভাষ্যমতে, সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই চাপের এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ বা জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা একদিকে খরচ বাড়াচ্ছে এবং অন্যদিকে মেশিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে চাপ কম থাকার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে ২০টি কারখানায় শ্রমিক ছুটি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদনব্যবস্থায় এই চাপ আরও কতটা বাড়বে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।"
শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার আনছার উদ্দিন জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোতে উৎপাদন গড়ে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এদিকে, সংকটের বিষয়ে মাহাদি সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। সুলতানা সোয়েটার্স ও বিএসপি স্পিনিং মিলস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।