জনপরিসরের খুব কম বিষয়ই আছে, যেগুলো নিয়ে বিতর্ক নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রভাব নিয়ে একটি ধারণা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত। প্রচলিত এই ধারণা অনুযায়ী, একটি ক্ষমতাবান অভিজাত গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উন্মুক্ত করেছিল, যার ফলে বিপুলসংখ্যক উৎপাদনশিল্পের চাকরি চলে যায় এবং দেশটিতে শিল্পায়নের শক্তি হ্রাস পায়। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের রাজনীতিবিদ, মূলধারার গণমাধ্যম, ভাষ্যকার এবং অনেক অর্থনীতিবিদ এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেন। তবে এই বর্ণনার সব অংশ সঠিক নয়।

২০০০ সালে চীনের সঙ্গে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পর দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রশ্ন ওঠে, এর ফলে কি যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে বিপুলসংখ্যক চাকরি কমেছিল?

২০১৩ সালে অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটর, ডেভিড ডর্ন ও গর্ডন হ্যানসনের একটি গবেষণায় বলা হয়, চীনা পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে চাকরি কমার সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের হিসাবে, ১৯৯০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে নিট ১৫ লাখ চাকরি কমেছিল। পরবর্তীতে ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও ব্রেন্ডান প্রাইসকে সঙ্গে নিয়ে করা গবেষণায় তাঁরা দেখান, চীনা আমদানির প্রতিযোগিতার কারণে ২০১১ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৪ লাখ চাকরি হারিয়ে থাকতে পারে।

তবে এই সংখ্যাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের স্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি ছাড়তেন বা তাঁদের চাকরি শেষ হয়ে যেত, যাদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার ছিলেন উৎপাদনশিল্পের শ্রমিক। এটি ওই সময়ের কোনো বিশেষ ঘটনা ছিল না এবং গত পাঁচ বছরেও শ্রমবাজারে চাকরি হারানোর মাত্রা মোটামুটি একই রকম রয়েছে।

বাণিজ্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু আমদানির প্রতিযোগিতার দিকটি দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ১৯৮০, ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য এবং বিশ্বায়নের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্যও নতুন ও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে কোনো খাতে চাকরি কমলে রপ্তানিনির্ভর খাতে নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, ফলে মোট কর্মসংস্থানে প্রভাব খুব বেশি হয় না। অর্থনীতিবিদ রবার্ট ফিনস্ট্রা ও তাঁর সহলেখকেরা বাণিজ্যের এই দুই দিকই হিসাব করার চেষ্টা করেছেন।

২০১৯ সালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণায় বলা হয়, ১৯৯১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে চীনা পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ লাখ চাকরি কমেছিল এবং অন্যান্য দেশের পণ্যের কারণেও আরও চাকরি হারিয়েছিল। তবে একই সময়ে রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় সমপরিমাণ নতুন চাকরিও তৈরি হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট পর্যন্ত মোট কর্মসংস্থানে উৎপাদনশিল্পের অংশ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০০৮ সালের সংকটে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় এই পতনের গতি বরং ধীর হয়েছিল। অর্থাৎ, উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমার প্রবণতা ‘চীন-ধাক্কার’ অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য নির্দেশ করে যে, এই পতনের প্রধান কারণ ছিল উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি, কেবল বাণিজ্য প্রতিযোগিতা নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৯০-এর দশকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত কোনো একক বা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। ২০০০ সালে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্কের মর্যাদা এবং ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের আগেই ১৯৮০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর চীনের স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্কের মর্যাদা নবায়ন করত। ১৯৮০-এর দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিতে চীনা পণ্যের অংশ বাড়তে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে এই অংশ ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৯৯৩ সালে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ১৯৯৯ সালে ৮ শতাংশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর ২০০০ সালে তা ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০০৭ সালের মধ্যে বেড়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়।

তথাকথিত ‘চীন-ধাক্কা’ সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ভূমিকা যতটা বড় মনে করা হয়, বাস্তবে তা ততটা ছিল না। স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক অনিশ্চয়তা দূর করে চীনের রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করলেও, দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী সংস্কার এবং শুল্কহার কমানোর পদক্ষেপগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যক্তিগত ও বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তের ফলেই চীনা পণ্যের চাহিদা বেড়েছিল।

তাই চীন-ধাক্কার ঘটনাকে বাণিজ্য উন্মুক্ত করার ক্ষতিকর প্রমাণ হিসেবে বা কোনো অভিজাত গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তবে ২০০০-এর দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দুটি শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, এক খাত থেকে অন্য খাতে শ্রমিকদের স্থানান্তর বাস্তবে ততটা সহজ নয় যতটা অর্থনীতিবিদরা ভেবেছিলেন। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সুযোগ কমে যাওয়া অঞ্চল থেকে মানুষ দ্রুত অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হতে চান না।

এই শিক্ষা বর্তমান সময়ে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রযুক্তির কারণে কোনো এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রমিকদের জন্য সরকারি সহায়তা বা আয়ের ভর্তুকির কথা ভাবা যেতে পারে। তবে লেখক মনে করেন, “নীতিনির্ধারকদের অর্থনীতির চারপাশে দেয়াল তুলে দেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতিও ধীর করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। ভবিষ্যতের দিকে ভয় নিয়ে নয়, আশাবাদ নিয়ে এগোতে হবে। অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উদারতাকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির বাধা হিসেবে দেখা ভুল। বাস্তবে এগুলোই দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।”

মাইকেল আর স্ট্রেইন আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের অর্থনৈতিক নীতি গবেষণা বিভাগের পরিচালক।