যশোরের তিনটি উপজেলায় চারটি নদ-নদীর ওপর নির্মাণাধীন আটটি সেতুর উচ্চতা নির্ধারিত মাপের চেয়ে অনেক কম হওয়ার ঘটনাটি কেবল ‘প্রকৌশলগত ভুল’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চরম দায়িত্বহীনতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) গেজেট অনুযায়ী, নদীর সর্বোচ্চ পানির স্তর থেকে সেতুর গার্ডারের ব্যবধান কমপক্ষে ১৫ ফুট হতে হয়। তবে এসব সেতুতে সেই উচ্চতা কোথাও ৬ ফুট, কোথাও ৮ ফুট। এর ফলে নৌপথ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, পণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঘটনাটি আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ত্রুটির বিষয়ে অবগত ছিল। ২০১৮-১৯ সালে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সেতুগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা নেওয়া হয়নি। বিআইডব্লিউটিএ এ বিষয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছিল, তা সত্ত্বেও কাজ বন্ধ করা হয়নি।

ভৈরব, বেতনা, শ্রী ও মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর এই সেতুগুলো নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যে একটি সেতুর কাজ প্রায় শেষ। অন্য পাঁচটির অগ্রগতি ৮০-৯৫ শতাংশ এবং বাকি দুটির কাজ যথাক্রমে ৬০ ও ৩২ শতাংশ। বিস্তারিতভাবে, ভৈরবের তিনটি সেতুর কাজ ৬০, ৮০ ও ৩২ শতাংশ; বেতনার দুটির ৮৬ ও ৯২ শতাংশ; মুক্তেশ্বরীর দুটির ৮৪ ও ১০০ শতাংশ এবং শ্রী নদীর সেতুটির কাজ ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে আদালতের নির্দেশে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে এবং পাঁচটি প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও লজ্জাজনক করে তুলেছে। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, তিনি তখন দায়িত্বে ছিলেন না। অন্যদিকে, সাবেক একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন নেওয়া হয়নি কারণ অনুমোদন নিলে ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি পেত। নকশা শাখার এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তৎকালীন কর্মকর্তাদের দায় থাকলেও তাঁরা এখন অবসরে চলে গেছেন এবং বর্তমানে সেতুগুলো শেষ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই ধরনের যুক্তি দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। নদী, নৌপথ এবং নির্ধারিত উচ্চতার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নকশায় বিবেচনা করতে না পারলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের কারিগরি জ্ঞানের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে।

২০২৪ সালের মে মাসে হাইকোর্ট যথাযথ নীতিমালা মেনে সেতুগুলো নির্মাণ এবং সাময়িকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। তখন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ছয় মাসের মধ্যে নীতিমালা মেনে কাজ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এলজিইডির প্রকৌশলীরা আটটি সেতু পরিদর্শন করে নকশা সংশোধনের তথ্য সংগ্রহ করেন। পরিকল্পনা করা হয়েছে ক্রেন দিয়ে গার্ডার তুলে পিলারের উচ্চতা বাড়িয়ে পুনরায় পাটাতন বসানোর। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত আড়াই বছরে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্রের জন্য কোনো আবেদন করা হয়নি।

এখন প্রশ্ন জাগে, এত কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং তদারকি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ছাড়পত্র ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলো? বিআইডব্লিউটিএর আপত্তির পরও কেন কাজ চলল এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে এত বিলম্ব হলো? সরকারের উচিত দ্রুত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে নকশা অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, তদারকি এবং আপত্তির পরও কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রত্যেকের দায়িত্ব নির্ধারণ করা। অবহেলা, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের দায় নিশ্চিত করতে হবে।

সেতুগুলো ভেঙে ফেললে ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকার ক্ষতি হবে—এটি সত্য। তবে ভুল নকশার সেতু রেখে দিলে নদী ও নৌপথের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আরও ভয়াবহ হবে। তাই সম্পদের অপচয় এবং জনদুর্ভোগের বিষয়টি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। যশোরের এই আটটি সেতুর স্থায়ী সমাধান এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।