রাজধানীর সদরঘাট থেকে বাবুবাজার সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত বাদামতলী ফলের আড়ত পুরান ঢাকার এক ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র এবং সারা দেশে ফল সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রায় শত বছরের পুরোনো এই বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই বাজার ঘিরে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ ব্যবসায়ী, ট্রাকচালক এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।
মুক্তকণ্ঠের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ডে (বাকল্যান্ড বাঁধ) রসিদহীন চাঁদাবাজির এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী একটি ট্রাকের পার্কিং ফি ১০০ টাকা। কিন্তু বেনাপোলসহ দূরদূরান্ত থেকে ফল নিয়ে আসা ট্রাকচালকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। কন্টেইনারবাহী লরির ক্ষেত্রে এই অংকের পরিমাণ ছয় হাজার থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। দৈনিক দেড় শতাধিক ফলের ট্রাক থেকে এই চাঁদাবাজির মাধ্যমে মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থ সংগৃহীত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এমনকি ইয়ার্ডের ছোট চা ও খাবারের দোকানগুলোও প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছে; অন্যথায় তাদের মারধর ও উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তন এবং আইনি জটিলতাকে পুঁজি করেই এই চাঁদাবাজি চলছে। আগে আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক গৃহীত ইজারা এখন স্থানীয় শ্রমিক দল ও যুবদলের কিছু নেতা-কর্মীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটিএ আইনি মামলার অজুহাত দেখিয়ে প্রতি মাসে ইজারার মেয়াদ বাড়িয়ে দায় সারছে। বিআইডব্লিউটিএ-র এক কর্মকর্তার বক্তব্য, "লিখিত অভিযোগ দিলে তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন।"
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, চাঁদার টাকার একটি অংশ বিআইডব্লিউটিএ-র অসাধু কর্মকর্তাদের কাছেও যায় এবং লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা করাটা কেবল একটি অজুহাত মাত্র।
দেশের পাইকারি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে এভাবে স্থানীয় পেশিশক্তি ও চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি রাখা কাম্য নয়। আড়তদারদের মতে, চাঁদাবাজির এই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত না করে কোনো উপায় থাকে না, যার ফলে সাধারণ ভোক্তাদেরই বেশি দাম দিয়ে ফল কিনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি স্থানীয় ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনকে জানানো হয়েছিল। গত জুন মাসে তিনি পার্কিং খরচ কমানোর কথা বলে দিলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংসদ সদস্যকে অবহিত করার পরও চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিআইডব্লিউটিএ-র উচিত দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসন করে স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা প্রদান করা এবং পার্কিং ফি আদায়ে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব চাঁদাবাজকে উচ্ছেদ করতে হবে। আশা করা যায়, চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চা বন্ধ করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।