জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস আবার সংঘাতের মাঠ হয়ে উঠল। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়—ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে অল্প কয়েক দিনেই আহত হয়েছেন শতাধিক শিক্ষার্থী।

কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির টানাপোড়েন সংসদীয় দর-কষাকষির সীমা ছাড়িয়ে রাজপথে নেমে এসেছে। জুলাইয়ে যে প্রত্যাশা প্রবল ছিল—নতুন বাংলাদেশ সহনশীল, গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হাঁটবে, তা যেন ক্রমেই দূরের স্বপ্ন হয়ে উঠছে। ঠিক এই উত্তপ্ত পটভূমিতেই বছরের শেষভাগে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে—এই নির্বাচন কি দলীয় দখলদারির আরেকটি রণক্ষেত্র হয়ে উঠবে, নাকি তৃণমূল থেকে সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্র পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হতে পারে?

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধির অনুপস্থিতি প্রায় দুই বছর ধরে চলছে। বেশির ভাগ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা এখন সরকার নিযুক্ত প্রশাসকের অধীন; তাঁরা মূলত সরকারি কর্মকর্তা। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরে প্রথম ধাপের ভোট শুরু করতে চায় তারা। প্রথম ধাপে থাকছে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা। সব ধাপ শেষ হতে সময় লাগবে ১০ থেকে ১২ মাস।

.স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন জরুরি.

দেশে এখন সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ, প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৪৯৫টি উপজেলা এবং সদ্য গঠিত বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। জনপ্রতিনিধিহীনতার এই দীর্ঘ শূন্যতা পূরণে দ্রুত নির্বাচন জরুরি—এ নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। প্রশ্নটা তাই ‘নির্বাচন হবে কি না’ নয়, প্রশ্নটা ‘কেমন নির্বাচন হবে’।

কারণ, কেবল ভোট আয়োজনই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় গণতন্ত্রের একটি গভীরতর তাৎপর্য আছে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আলেক্সি দ্য ট্যকভিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনকে বলেছিলেন ‘গণতন্ত্রের পাঠশালা’—যেখানে নাগরিক নিজে শাসন করতে, দেনদরবার করতে এবং সিদ্ধান্তের দায় নিতে শেখে; এই স্থানীয় স্বাধীনতাই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে বৈধতা দেয় ও স্থিতিশীল রাখে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পাটনাম ইতালির আঞ্চলিক সরকার নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন, যেখানে নাগরিক অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক আস্থার ‘সামাজিক পুঁজি’ বেশি, সেখানে স্থানীয় শাসন বেশি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য। এর অর্থ তৃণমূলে অংশগ্রহণের সুযোগ মানুষকে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করে, ক্ষমতার হিস্যা ছড়িয়ে দেয় এবং ‘বিজয়ী-সব-নেয়’ রাজনীতির চাপ কিছুটা লাঘব করে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতার তীব্র প্রতিযোগিতা যখন সমাজকে বিভক্ত করছে, তখন কার্যকর স্থানীয় গণতন্ত্র সেই চাপ শুষে নেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।

.
স্থানীয় নির্বাচন হবে একটি পরীক্ষা, নতুন বাংলাদেশ কি জুলাইয়ের প্রতিশ্রুত সহনশীল ও বহুত্ববাদী রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের পুরোনো ‘সব খেয়ে ফেলার’ সংস্কৃতিকেই তৃণমূলে ছড়িয়ে দেবে?
.

তবে এই যুক্তি একতরফাভাবে নেওয়া বিপজ্জনক। বিকেন্দ্রীকরণ আপনা–আপনি গণতান্ত্রিক নয়। দুর্বল আইনশৃঙ্খলার ভেতর স্থানীয় নির্বাচন উল্টো স্থানীয় মাস্তান, পেশিশক্তি ও কালোটাকার দখলদারিকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। আরও বড় ঝুঁকি হলো কেন্দ্রের সংঘাত সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন আর শত শত পৌরসভায় ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় সহিংসতাকে জাতীয় রূপ দিতে পারে। তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার—নির্বাচন প্রয়োজনীয়; কিন্তু যথেষ্ট নয়।

আর এই ‘যথেষ্ট নয়’-এর গভীরতম কারণটি প্রাতিষ্ঠানিক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল পাঁচটি পৃথক আইনকে একীভূত করা থেকে শুরু করে কর্তৃত্ব ও কার্যাবলির প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ করার মতো অত্যন্ত জরুরি সুপারিশ। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, পর্যালোচনা বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ে না। নীতিমহলে বহুদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত যে ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদে কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের কার্যকর অর্পণ ছাড়া স্থানীয় সরকার কার্যত অর্থহীন। অথচ বিস্ময়করভাবে এ প্রশ্নে যেন সব দলের এক অদৃশ্য ঐকমত্য—কেউই স্থানীয় সরকারের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ক্ষমতাহীন পরিষদের নির্বাচন শেষ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে একধরনের প্রবঞ্চনামাত্র।

.সংস্কার ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন নতুন সমস্যা তৈরি করবে.

সরকার ও কমিশন ছোট এককগুলোতে ইউনিয়ন ও পৌরসভা—আগে নির্বাচন করার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা যৌক্তিক। এতে ঢাকাকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সুযোগ থাকে। উপজেলা ও জেলা পরিষদ, বর্তমান কাঠামোয় যাদের রাজনৈতিক ওজন তুলনামূলক কম, সেগুলো পরে আয়োজন করলেই চলে।

এবার দুই দফা দলীয় প্রতীকের নির্বাচনের পর আবার নির্দলীয় প্রতীকে ফেরা হচ্ছে; কিন্তু নির্দলীয় প্রতীক নিজে থেকেই সংঘাত কমাবে—এমন ভাবা সরলীকরণ হবে। ইতিমধ্যে বিএনপি প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড ও স্থানীয় জোটের কথা ভাবছে; জামায়াত-শিবিরও সংগঠিত। প্রতীক না থাকলেও প্রক্সি প্রার্থীর মধ্য দিয়ে দলীয় বিভাজন ঠিকই মাঠে হাজির থাকবে। কাঠামোগত নকশার ওপর অতিরিক্ত ভরসা না রেখে তাই বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকেই নজর দিতে হবে।

অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটিও কেন্দ্রীয়। ১৯৯৭ সালের সংশোধনীর পর সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের সুবাদে তৃণমূলে নারী নেতৃত্বের একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। আজ অসংখ্য নারী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান; কিন্তু অনলাইন হেনস্তা, চরিত্রহনন এবং টাকানির্ভর প্রচারণার সংস্কৃতি তাঁদের অংশগ্রহণকে সংকুচিত করতে পারে। জুলাইয়ে নারীরা রাজপথে ছিলেন, অথচ পরবর্তী বন্দোবস্তে তাঁদের উপস্থিতি ক্ষীণ—সেই বাদ পড়ার ধারা যেন স্থানীয় নির্বাচনে ফিরে না আসে।

পাশাপাশি আরেকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন—আওয়ামী লীগের যেসব সমর্থক ও সদস্য আইনি যোগ্যতা পূরণ করে ভোটে দাঁড়াতে চান, তাঁদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ। নির্বাচন কমিশন নীতিগতভাবে সব দলের সমর্থকের—আওয়ামী লীগসহ প্রার্থিতার সুযোগ খোলা রাখার কথা বলেছে; কিন্তু কাগজের বিধান আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে যেন দূরত্ব তৈরি না হয়।

.দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কি আওয়ামী লীগের ‘ভুল’ ছিল.

এই বাস্তবতায় তফসিল ঘোষণার আগেই কয়েকটি বিষয় নিষ্পত্তি হওয়া দরকার; আর তার সিংহভাগ দায়িত্ব সরকারের। প্রথম কাজ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি; অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান লোকদেখানো নয়, আন্তরিকভাবে চালাতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বড় দলগুলোর সঙ্গে বসে একটি সুস্থ, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের ন্যূনতম সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষত ইউএনওদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজ নিজ এলাকায় নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করার দায় বুঝিয়ে দিতে হবে; আর অনলাইন হেনস্তা ও অপপ্রচার শনাক্ত, অপসারণ ও শাস্তির জন্য একটি পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা যেতে পারে।

শেষবিচারে স্থানীয় নির্বাচন হবে একটি পরীক্ষা, নতুন বাংলাদেশ কি জুলাইয়ের প্রতিশ্রুত সহনশীল ও বহুত্ববাদী রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের পুরোনো ‘সব খেয়ে ফেলার’ সংস্কৃতিকেই তৃণমূলে ছড়িয়ে দেবে? ভোট যদি শান্তিপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবে তা কেবল স্থানীয় সরকারকে নয়, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের বৈধতাকেও শক্ত ভিত্তি দেবে। সেই সুযোগ হাতছাড়া হলে ক্ষতি স্থানীয় গণ্ডিতে সীমিত থাকবে না।

কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক 

* মতামত লেখকের নিজস্ব