কক্সবাজার শহর ও এর আশপাশের সরকারি পাহাড়গুলো নির্বিচারে কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করার যে খবর মুক্তকণ্ঠয় প্রকাশিত হয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং গভীর আশঙ্কার কারণ। গত মাসে কক্সবাজারে ভূমিধসে প্রায় ২৯ জনের মৃত্যুর শোক আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। গত ১৩ বছরে এই জেলায় ভূমিধসে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩৭০ জন। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, নির্বিচার পাহাড়নিধনই ভূমি ও পাহাড়ধসের মূল কারণ। তাই পাহাড় কাটার এই খবর আমাদের চরমভাবে শঙ্কিত করে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজার জেলার অন্তত ১০টি ছোট-বড় সরকারি পাহাড় কাটা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী কিছু চক্র রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে পাহাড় কেটে সমতল করছে। এই মাটি একদিকে যেমন বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সমতল করা জমিতে বসতি ও হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনার কথা খবরে প্রকাশ পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাদশাঘোনা এলাকায় গত দেড় বছরে পাহাড় কেটে চার শতাধিক বসতি নির্মাণ করা হয়েছে।
পাহাড় কাটার ফলে যেমন নিয়মিত ভূমিধসে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, তেমনি ওই অঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। গাছপালা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় বাস্তুতন্ত্র বিনষ্ট হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের মাটি শহরের নালা ও ড্রেন ভরাট করায় সড়ক ও উপসড়কে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাণ ও প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়নের প্রভাব যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, পাহাড় যেন সেই নজির আবারও আমাদের সামনে তুলে ধরছে।
পাহাড়নিধনে প্রভাবশালী চক্রের সক্রিয়তার বিপরীতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক তৎপরতার দুর্বলতা অত্যন্ত প্রকট। বলা হচ্ছে, প্রায় রাতেই পাহাড় কাটা হয় বলে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার দায়ে মামলা হলেও সেগুলোর অগ্রগতি খুবই সামান্য। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁরা দ্রুত মুক্তি পেয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং প্রশাসনের এই ঢিলেঢালা মনোভাব পাহাড়খেকোদের দুঃসাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এমতাবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। পাহাড় রক্ষার সাথে যেমন পরিবেশ জড়িত, তেমনি নাগরিক জীবনের সুরক্ষার প্রশ্নও জড়িত। তবে আইনের হাত যেন কেবল দরিদ্র শ্রমিকদের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন পুরো সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে সক্ষম হয়—আমরা তেমন প্রত্যাশা করি। নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী অর্থদাতা, প্লট ব্যবসায়ী ও তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করে আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে জোর করে উচ্ছেদ না করে সমতলে তাদের পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে।