চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বক্তব্য নজরে আসে। তিনি প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক বাংলা পড়ার দক্ষতা অর্জন করেনি। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক ও সৃজনশীল করে গড়ে তুলতে কারিকুলামে ‘সায়েন্স টয়’ ও ‘ম্যাথ ল্যাব’ যুক্ত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে দুটি শেখার পথের ইঙ্গিত স্পষ্ট—এক, বই পড়ে শেখা; দুই, হাতে-কলমে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখা। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সময়ে শিশুর শেখা ও জ্ঞান আহরণের প্রেক্ষাপট কি কেবল এই দুই পথেই সীমাবদ্ধ?
আজকের শিশুর বড় একটি অংশ সময় কাটে শ্রেণিকক্ষের বাইরে ডিজিটাল মাধ্যমে। ইউটিউবের ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ, গুগল–ইয়াহু সার্চ, নানা ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাপ ব্যবহার, গেম খেলা—এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে প্রশ্ন তুলে উত্তর পাওয়াও এখন নিত্যদিনের অংশ। ফলে মিডিয়া শিশুদের কাছে কেবল বিনোদনের উৎস নয়; ক্রমেই তা শেখার পরিবেশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠছে।
এই নতুন শেখার পরিবেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সব তথ্য বা কনটেন্ট সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য নয়। একই প্ল্যাটফর্মে শিক্ষামূলক ও সত্য কনটেন্টের পাশাপাশি থাকতে পারে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, বিজ্ঞাপন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বানানো কনটেন্টও। তাই বই পড়ে শেখা এবং হাতে-কলমে কাজের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য বুঝতে, যাচাই করতে এবং গ্রহণ করতে শেখানো—এটিও কি শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত নয়?
এখানেই মিডিয়া লিটারেসির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। শিশু যেহেতু মিডিয়া-পরিবেশ থেকেও শিখছে, তাই শেখাতে হবে কীভাবে তথ্যকে প্রশ্ন করতে হয়, উৎস যাচাই করতে হয়, এবং তথ্য–মতামত–বিজ্ঞাপন–বিনোদনের পার্থক্য শনাক্ত করতে হয়। পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী ছবি বা ভিডিও আসল নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত—এ সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা গড়ে তোলা দরকার।
ইউনেসকো ডিজিটাল যুগের জন্য ‘মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি সিটিজেন্স: থিংক ক্রিটিক্যালি, ক্লিক ওয়াইজলি’ নামে একটি মডেল কারিকুলাম তৈরি করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৭টি দেশের ৪২টি স্কুলে এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়। এই উদ্যোগই ইঙ্গিত দেয়—মিডিয়া ও বিপুল তথ্যের জটিল পরিবেশে শিক্ষার্থীদের সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে স্কুল কারিকুলামে মিডিয়া লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করার বিকল্প কমে আসছে। কারণ, বিষয়টি এখন বৈশ্বিক পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রে।
ইউনেসকোর তৎকালীন যোগাযোগ ও তথ্যবিষয়ক সহকারী মহাপরিচালক তৌফিক জেলাসি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ডিজিটাল যুগে সচেতন, সহনশীল ও ক্ষমতায়িত সমাজ গঠনের জন্য মিডিয়া লিটারেসিকে একটি অপরিহার্য দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, এ ধরনের দক্ষতাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে যুক্ত করতে সব দেশেই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ফিনল্যান্ডের অভিজ্ঞতা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। দেশটি মিডিয়া লিটারেসিকে পৃথক কোনো বিষয় না রেখে বরং প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যক্রমে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ‘মাল্টিলিটারেসি’ বা বহুমুখী সাক্ষরতার অংশ হিসেবে এটিকে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং বিষয়ভিত্তিক শেখার মডিউলের মাধ্যমে তা বিকশিত করা হয়।
প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ধাপে ধাপে ভাষা ও সাহিত্য, চারুকলা, সামাজিক বিজ্ঞান, ইতিহাস ও স্বাস্থ্যশিক্ষার মতো বিষয়ের মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের মিডিয়া ও তথ্য বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়নের দক্ষতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্ষেত্রে অনলাইন নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়ার ফলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে নতুন করে স্বতন্ত্র বিষয় যোগ না করেও বিদ্যমান পাঠ্যক্রমে মিডিয়া লিটারেসির জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি দুইভাবে ভাবা যেতে পারে—এক, দীর্ঘ মেয়াদে মিডিয়া লিটারেসিকে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে চালু; দুই, সুযোগ বা প্রস্তুতি না থাকলে প্রাথমিকভাবে বিদ্যমান পাঠ্যবইয়ে বয়স-উপযোগী অধ্যায় হিসেবে মিডিয়া লিটারেসি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা। এতে শিশুরা পর্যায়ক্রমে মিডিয়া পরিবেশ সম্পর্কে বুঝতে, মিডিয়ার তথ্য বুঝতে, উৎস চিনতে, তথ্য ও মতামতের পার্থক্য করতে এবং ছবি, ভিডিও বা ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ে প্রশ্ন করতে শিখবে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে এটিকে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে গড়ে তোলার পথও তৈরি হবে।
আজকের শিশুর শেখার পরিবেশে মিডিয়ার প্রভাব যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন তথ্য গ্রহণের দক্ষতার পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা ও যাচাই করার যোগ্যতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাই শিশুর জন্য দরকার সমন্বিত শিক্ষাপদ্ধতি: বই পড়ে শেখা, হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখা, এবং মিডিয়া-পরিবেশ থেকে পাওয়া তথ্যকে বুঝে-যাচাই করে শেখা—এই তিনটি পথকে একত্রে দেখা জরুরি। মৌলিক পড়ার দক্ষতা ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ নিশ্চিত করাও যেমন সত্য ও প্রয়োজন, তেমনি শিশুর বাস্তব শেখার পরিবেশ হিসেবে মিডিয়াকেও বুঝতে শেখানো জরুরি।
বই থেকে শেখা, অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখা এবং মিডিয়া-পরিবেশকে বোঝার দক্ষতা—এই তিনের সমন্বয়েই বর্তমান শিশুর কারিকুলাম গড়ে উঠতে পারে। আলাদা আলাদা করে দেখলে চলবে না। সায়েন্স টয় বা ম্যাথ ল্যাবের পাশাপাশি মিডিয়া লিটারেসিকে কাঠামোর ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
জান্নাতুল রুহী
সাংবাদিক ও লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব