আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয় মানুষের ঢল। তাঁরা দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন। বিক্ষোভের পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ। বসন্তে গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর অনেক পর্যটক হোটেল বুকিং বাতিল করেছেন। তবে হোটেলকর্মীদের কেউ কেউ গোপনে ইঙ্গিত দেন, পর্যটকেরা চাইলে বিক্ষোভে যোগ দিলেও তাঁরা আপত্তি করবেন না।
এই আন্দোলনের নাম হয়েছে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’। এর পেছনে রয়েছে আলবেনিয়া সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিতর্কিত চুক্তি। ঘটনাটি ট্রাম্পের রাজনীতির এক অপ্রত্যাশিত বৈশ্বিক প্রভাবকেই সামনে এনে দিয়েছে। কোনো সরকার যদি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করে, তাহলে সেই সম্পর্কই দেশটির বিরোধীদের হাতে নতুন করে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
মাত্র এক বছর আগের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি ধ্বংসের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সে সময় স্বৈরশাসকেরাও এই বার্তা পান—তাঁদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ নাও আসতে পারে। শক্ত হাতে দেশ পরিচালনাকারী নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্বৈরশাসকেরা উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসাও পেতে পারেন বলে আশায় ছিলেন কেউ কেউ।
সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ ইউএসএআইডির সহায়তা পাওয়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় পুলিশি অভিযান চালানোর সময় ইউএসএআইডিকে ইলন মাস্কের ‘অপরাধী সংগঠন’ বলার কথা উল্লেখ করেন। কিছু হিসাব অনুযায়ী, মাস্কের ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তা সত্ত্বেও বিশ্বের স্বৈরশাসকেরা সংস্থাটির অবসানকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছিলেন।
‘স্বৈরতন্ত্র ইনকরপোরেটেড’-এর সদস্যদের অন্তত বোঝা উচিত ছিল—ট্রাম্পের সমর্থন সব সময় আশীর্বাদ নাও হতে পারে। ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরে কোনো সরকারের দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
ট্রাম্প বিশ্বের বহু দেশে অজনপ্রিয়। ফলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সরকারগুলোর বিরোধীরা সহজেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জনসমর্থন জোগাড় করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির সূক্ষ্ম বিষয় না জানলেও মানুষের শোনা—কাতারের দেওয়া ট্রাম্পের তথাকথিত ‘উড়ন্ত ঘুষের প্রাসাদ’-এর মতো কেলেঙ্কারির কথা।
আলবেনিয়ার ঘটনাটিও সেই ধারার সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। কুশনার ও ইভানকা ট্রাম্প দাবি করেন, আলবেনিয়ার উপকূলে সাজানো এক দ্বীপ ‘আবিষ্কার’ করেছেন। কিন্তু ওই দ্বীপটি বহুদিন ধরে আলবেনিয়ার সামরিক ঘাঁটি এবং তা মোটেও অজানা নয়। তাঁরা ধনকুবের বন্ধু নাথানিয়েল রথশিল্ডের প্রমোদতরিতে অবস্থানকালে এদি রামার সঙ্গেও ছিলেন। পরে তাঁরা সাজানো বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে এলাকাটি ফ্লেমিঙ্গোর জন্য নির্ধারিত প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করলে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের ওপর রুক্ষভাবে হামলা চালায়। ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষোভ দক্ষিণাঞ্চল থেকে তিরানায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন প্রতিদিন সন্ধ্যায় গণবিক্ষোভ হচ্ছে। ফ্লেমিঙ্গো হয়ে উঠেছে আন্দোলনের প্রতীক—কোথাও কাগজের প্রতিকৃতি, কোথাও বিশাল গোলাপি ফোলানো ফ্লেমিঙ্গো।
বিক্ষোভকারীদের হাতে আলবেনিয়ার পতাকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাও রয়েছে। আলবেনিয়া ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী। তাই তাঁরা বোঝাতে চান—আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নয়; এটি দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে।
ট্রাম্প এ আন্দোলনের আদর্শ অনুঘটক। তাঁর সমালোচকদের মতে, তিনি অধিকাংশ কর্তৃত্ববাদী নেতার চেয়েও প্রকাশ্য ও নির্লজ্জভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁরা বলেন, তিনি হীরা থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সির অর্থ পর্যন্ত মূল্যবান উপহার গ্রহণ করেন এবং শুল্ক কমানো বা ক্ষমা প্রদানের মতো সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে এসব উপহারের সম্পর্ক দেখা যায়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের শেয়ারবাজারে আগাম সুবিধা নেওয়া ও বাজার প্রভাবিত করার অভিযোগও আছে। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাজার প্রভাবিত বক্তব্য আগেভাগে পাওয়ার সুযোগ বিক্রির ঘটনাও এসব অভিযোগকে আরও গুরুত্ব দেয়।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি দুর্নীতি চর্চা প্রতিরোধ আইন প্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে—যদিও এটি বিদেশে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল। চলতি গ্রীষ্মে করপোরেট স্বচ্ছতা আইনও দুর্বল করা হয়েছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একসময় এটিকে কয়েক দশকের মধ্যে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারবিরোধী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন বলে উল্লেখ করেছিলেন। আইন দুর্বল হওয়ায় অপরাধীদের কাগুজে কোম্পানির আড়ালে পরিচয় ও সম্পদ লুকানো সহজ হয়েছে।
ট্রাম্পের ‘ভুয়া খবর’ তত্ত্ব স্বৈরশাসকদের সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণের সুযোগ দিয়েছে। তবে তাঁর প্রকাশ্য দুর্নীতি উল্টো অন্য দেশের নেতাদের দুর্নীতির দিকেও মানুষের নজর ফিরিয়ে আনছে।
আলবেনিয়ায় ক্ষোভ শুধু রামার বিরুদ্ধে নয়। বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী সালি বেরিশাও সমালোচিত। অর্থাৎ পুরো রাজনৈতিক শ্রেণিটিই নৈতিকভাবে অভিযুক্ত—এ রকম ভাবনা প্রচলিত হয়েছে। আলবেনিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে চায়; কিন্তু কুশনারদের মতো প্রভাবশালী বিদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম উপেক্ষা করলে সেই সম্ভাবনা দুর্বল হতে পারে বলে সতর্কতা উঠেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরাও রামাকে সতর্ক করেছেন।
রামার বক্তব্য—কুশনার না থাকলে কেউ ফ্লেমিঙ্গো বা আলবেনিয়া নিয়ে মাথা ঘামাত না; ট্রাম্পের প্রতি ঘৃণাই এত নজরদারি তৈরি করেছে। কথাটি আংশিক সত্য। তবে বড় সত্য হলো, ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন যে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জোরদার করবে—তা এক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
ট্রাম্পের রাজনীতি স্বৈরশাসকদের নতুন সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তাঁর প্রকাশ্য দুর্নীতি তাঁদের জন্য নতুন বিপদও তৈরি করেছে। এখন ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে ধরতে পারে। আলবেনিয়ার ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে আন্দোলন নয়; এটি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ।
এটাই ট্রাম্পের রাজনীতির অপ্রত্যাশিত পরিহাস—বিশ্বের স্বৈরশাসকদের বন্ধু ট্রাম্পই এখন তাঁদের জন্য নতুন শত্রু হয়ে উঠেছেন।
জ্যঁ-ভের্নার মুলার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক।