আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বুধবার জবানবন্দিতে আশিকুর রহমান আছিফ দাবি করেছেন যে, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তার প্রেক্ষিতে তাঁর বাবা ও টিপু কাকাকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ—যিনি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
ভুক্তভোগী পরিবারের এই সদস্য জানান, তিনি জবানবন্দিতে বিচার চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাবা ও টিপু কাকার হত্যার বিচার চাই।’
ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় বুধবার তিনি ছিলেন ১৩তম সাক্ষী। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ছাত্রদল ও জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) দুই নেতা টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ার দেওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চারজন আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলছে।
মামলার চার আসামির মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ পলাতক রয়েছেন। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন কারাগারে আছেন।
২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রসফায়ারের শিকার হন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। নিহত কবির মোল্লার ছেলে আশিকুর রহমান ওই জবানবন্দি দেন।
২২ বছর বয়সী আশিকুর রহমান জবানবন্দিতে বলেন, তাঁর বাবা কবির মোল্লা দীর্ঘদিন আগৈলঝাড়া থানার নগরবাড়ী গ্রামে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তিনি নিজেও জানান, তাঁর বাবা ও টিপু হাওলাদার একসঙ্গে রাজনীতি করতেন।
তিনি দাবি করেন, আগৈলঝাড়া উপজেলায় টিপু-কবির জনপ্রিয়তা ছিল এবং বহু মানুষ তাঁদের পছন্দ করত। আশিকুরের বক্তব্য, এই জনপ্রিয়তার কারণে বরিশাল-১ আসনের তৎকালীন এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ তাঁদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাণনাশের হুমকিসহ বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি দেখাতেন এবং বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন।
আশিকুর বলেন, কিছুদিন পরপরই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর লোকজন তাঁদের বাড়িতে এসে হুমকি দিত এবং দলটিতে যোগ দেওয়ার কথা বলত। তাঁর ভাষ্য, ওই হুমকির কারণে তাঁর বাবা এলাকা ছেড়ে তাঁকে, তাঁর মা ও ভাইকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়া থানার কুরগাঁও এলাকায় চলে আসেন। সেখানে তাঁর বাবা বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন এবং তাঁর মা গার্মেন্টে কাজ করতেন।
তিনি জবানবন্দিতে আরও বলেন, ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাবার নামে আগৈলঝাড়া থানায় একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করার বিষয়টি তিনি জানতে পারেন। একই দিন তাঁর বাবা কুরগাঁওয়ের বাসা থেকে ১২–১৩ জন লোক এসে নিজেদের ডিবি (পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্য) পরিচয় দিয়ে নিয়ে যায় বলে তিনি জানান। আশিকুর বলেন, তাঁর মা জিজ্ঞাসা করলে আগত ব্যক্তিরা জানান, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর নির্দেশে তাঁর বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আশিকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, পরে ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে টেলিভিশনের খবরের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, তাঁর বাবা ও কাকা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। পরে গ্রামের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে মুঠোফোনে তিনি আরও জানান, পুলিশ তাঁর বাবা ও টিপু হাওলাদারকে খুন করেছে বলে জানা যায়।
আশিকুর বলেন, সন্ধ্যার সময় তিনি, তাঁর ছোট কাকা ও তাঁর মা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেখেন—পুলিশ তাঁর বাবার লাশ পোস্টমর্টেম হওয়ার পর বাড়িতে রেখে গেছে। তিনি দাবি করেন, লাশ দাফনের সময় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর লোকজন এসে গালাগালি করে দ্রুত লাশ দাফন করতে বলেছিল এবং ঢাকায় চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল।
তিনি বলেন, লাশ দাফন শেষে ঢাকায় ফিরে জানতে পারেন—রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ক্ষিপ্ত হয়ে বরিশাল জেলার এসপি এহসানউল্লাহের মাধ্যমে উজিরপুর থানার দুজন ভাড়াটিয়া পুলিশ এনে তাঁর বাবা ও টিপুকে খুন করা হয়। আশিকুরের অভিযোগ, উজিরপুর থানার ভাড়াটিয়া পুলিশ এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।
শেষদিকে আশিকুর বলেন, ভুক্তভোগী দুজন একসঙ্গে রাজনীতি করতেন এবং তাঁদের কোনো দোষ ছিল না; মামলাও ছিল না বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘শুধু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য আমার বাবা ও টিপু কাকার জনপ্রিয়তা দেখে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ক্ষিপ্ত হয়ে এসপি এহসানউল্লাহর মাধ্যমে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে দিয়ে আমার বাবা ও টিপু কাকাকে খুন করা হয়।’