ম্যাকাইয়ে আজকের সকালটা আগে কখনো এত সুন্দরভাবে দেখা হয়নি। গত রাতের ঠান্ডা কেটেছে; দিনে রয়েছে আরামদায়ক রোদ। দুপুরে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও পরিবেশের স্বস্তি নষ্ট হয়নি।
আবহাওয়ার পাশাপাশি এই সকালে বিশেষভাবে সৌজন্য নিয়েছেন মাইকেল জেমস নামের এক ভদ্রলোক। তিনি ফিলিপ স্ট্রিটে নিজের মোটেলের কাছাকাছি একটি জিম কাম হেলথ ক্লাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা। ফিটনেস কার্টল হেলথ ক্লাবস; সংক্ষেপে এফসি।
আজ সকালে এখানেই জিম করেছে বাংলাদেশ দল। জিম শেষে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন পেসার শরীফুল ইসলাম। ডারউইন টেস্টে না খেললেও সেই জয় তাঁকে কীভাবে আবেগাপ্লুত করেছিল, সে কথা জানিয়েছেন স্বল্পভাষী শরীফুল।
বাংলাদেশ দলকে নিয়ে প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু মাইকেল জেমসের সৌজন্যে এফসিতে ওঠার আগে যা ঘটেছে, সেটির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম না। সাংবাদিক—বাংলাদেশ থেকে এসেছি টেস্ট সিরিজ কাভার করতে—এটুকু বলার পরই মনে হলো, জেমস হয়তো মুক্তকণ্ঠেই আমার কোনো সহকর্মী কিংবা মুক্তকণ্ঠের ম্যাকাই প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ দলের প্রশংসা করে ডারউইন টেস্টে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান জেমস। এরপর বাংলাদেশ দল জিমে আসার আগেই তিনি আমাকে নিয়ে যান জিমের একেবারে শেষ প্রান্তে, যেটি আগে থেকেই বাংলাদেশ দলের ‘ওয়ার্কআউটের’ জন্য নির্দিষ্ট ছিল। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যায়ামের সরঞ্জাম, রিকভারি পুল, আলাদা করে মাটিতে বসানো রানিং ম্যাট—যা যা আছে, তা দেখাতে বাদ দেননি কিছুই।
কিছু সময় সামনে থেকে দেখা গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ‘ওয়ার্কআউট’। তবে সব সুযোগ নেওয়ার সুযোগও নেই—ক্রিকেটারদের ‘প্রাইভেসি’ বলে একটা ব্যাপার রয়েছে। সে কারণে অল্প সময় থেকেই সরে এসেছি।
বাংলাদেশ দল আসার আগেই জিম ঘুরিয়ে দেখানোর একফাঁকে জেমস হাতের ইশারায় একটি কোনার দিকে দেখিয়ে বলেন, ‘দেখো, ওরাও এসেছে...।’ ওরা মানে অস্ট্রেলিয়া দলের তিন ক্রিকেটার জশ হ্যাজলউড, জশ ইংলিস আর স্কট বোল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার আজ ছিল ঐচ্ছিক অনুশীলন। কেউ সেখানে গেছেন, কেউ হোটেলে থেকে গেছেন, আর এই তিনজন জিম করতে এসেছেন এফসিতে।
টেস্ট ম্যাচ না হলেও ভেন্যু ঘিরে অন্যদিনের কর্মকাণ্ড চলতেই থাকে। ফেলে আসা আলোচনার মধ্যেই মিলিয়ে যায় এই প্রস্তুতি—কারণ ৯ মাস আগে চালু হওয়া এফসি এ মুহূর্তে ম্যাকাইয়ের সবচেয়ে বড় জিম। অস্ট্রেলিয়া দলের ক্রিকেটাররা ম্যাকাইয়ে এলে জিম করতে এখানেই আসেন এখন। কথা প্রসঙ্গে জেমস বলেন, তিনি একসময় টুকটাক ক্রিকেট খেলেছেন। অস্ট্রেলিয়া দলের অনেকের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্বও আছে। একটু পর তারই ইঙ্গিত মেলে, যখন দেখা যায় জশ হ্যাজলউড নিজে থেকে এসে কথা বলছেন জেমসের সঙ্গে।
কথা হয় ক্রিকেটকে ঘিরেই। ডারউইন টেস্টের হার—এ প্রসঙ্গে হ্যাজলউডের মনোভাব ‘একটা খারাপ ম্যাচ হয়ে গেছে’ জাতীয়ই মনে হলো। তবে ম্যাকাই টেস্ট নিয়ে তাঁর আশাটা বড়, আর তার কারণ হিসেবে এখানকার উইকেট ও কন্ডিশনের কথাই উঠে আসে।
গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এ মাঠে একটি ওয়ানডে খেলেছেন হ্যাজলউড; ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সে অভিজ্ঞতা থেকেই অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারের কথাটা সরাসরিই দেখা যায়—‘ডারউইনের তুলনায় ম্যাকাইয়ের উইকেট আমাদের জন্য বেশি ভালো হবে। এখানে পেস, বাউন্স অনেক বেশি থাকবে। লম্বা বোলাররা ভালো করবে। সকালের দিকে বলে বেশ মুভমেন্টও থাকতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, বাতাস কেমন এখানে! ম্যাচে এটারও প্রভাব থাকবে।’ জেমসের সঙ্গে হ্যাজলউডের কথাও চলেছে কিছু সময়। বিষয়টি ব্যক্তিগত আলাপের মতো হওয়ায় পাশে দাঁড়িয়ে নীরব স্রোতা হয়েই থেকেছি তখন।
জিমের অন্যদিক ঘুরে একটু পর রিকভারি পুলেও দেখা গেছে তাঁদের তিনজনকে। ব্যায়ামের পর ক্লান্তি দূর করতে ছোট্ট পুলের পানিতে গা ভাসিয়ে আছেন। তাঁদের চেহারা পরিচিত হয়ে যাওয়ায় ‘প্রাইভেট এরিয়া’তে আমাকে দেখলেও কোনো অস্বস্তি ছিল না।
বাংলাদেশের মতো ক্রিকেটারদের কাছে যেমন সেলফি-আবদারের কমতি থাকে না, অস্ট্রেলিয়াতেও তার ব্যতিক্রম নেই। এফসির কর্মচারী এবং এখানে জিম করতে আসা সাধারণ মানুষের সেলফির অনুরোধও সামলাতে হয়েছে। কাছে দাঁড়িয়ে থাকায় ‘শিকারি’রা প্রথমেই ফোন দিয়ে ছবি তোলেন। তবে হ্যাজলউডের ক্ষেত্রে দেখা যায় আলাদা আগ্রহ—নিজে ‘সেলফি’ তোলায়। দূর থেকে ছবি তুলে দেওয়ার পরও সবার সঙ্গেই আবার ফোন হাতে নিয়ে সেলফি তুলেছেন। বোল্যান্ড আর ইংলিস তাতে বেশ মজাই পাচ্ছিলেন।
হ্যাজলউডের কাছ থেকেও এই খাতির আমিও পেয়েছি। মাইকেল জেমসের সৌজন্যে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তার পর ছবি তুলতে চাইলে হ্যাজলউড নিজেই নিয়ে নেন আমার ফোন। মুখে হাসি ফুটিয়ে আমাকেও হাসতে বলে ছবিটা তুলে দেন নিজের সঙ্গে। জিমের আলো-আঁধারির মধ্যেও ছবিটা খারাপ আসেনি।
শেষদিকে বোঝা গেল, লম্বা বোলাররা সেলফিও তুলতে বেশ পারদর্শী।