কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চিলমারী নদীবন্দর প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর পদচারণায় মুখর থাকলেও সেখানে ন্যূনতম যাত্রীসেবার অভাব প্রকট। রৌমারী ও রাজীবপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের নৌপথে যাতায়াতের প্রধান এই ঘাটে নেই কোনো যাত্রীছাউনি, গণশৌচাগার কিংবা পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। ফলে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের, যার ফলে নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি একসময় দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের সাথে এর জৌলুস কিছুটা কমলেও গুরুত্ব অপরিবর্তিত রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, নিরাপদ কোনো অপেক্ষালয় না থাকায় যাত্রীরা খোলা আকাশের নিচে বসে নৌকার অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অসুস্থ ও বয়স্কদের কষ্ট চরমে পৌঁছায়।
যাত্রীছাউনির পাশাপাশি এখানে কোনো গণশৌচাগার না থাকায় দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েন। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টকর; অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে খোলা জায়গায় শৌচকর্ম সারতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
রৌমারী উপজেলা থেকে আসা বেলাল হোসেন বলেন, "অনেক দূর থেকে নৌকায় করে আসি। ঘাটে এসে বসার বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কোনো টয়লেট নেই। নারীদের জন্য বিষয়টি আরও কষ্টের। এত বড় ঘাটে অন্তত একটি গণশৌচাগার থাকা উচিত।"
একই উপজেলার শাহারিয়ার নাজিম বলেন, "নৌকার জন্য অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বৃষ্টি এলে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের নিয়ে খুব কষ্ট হয়। যাত্রীদের জন্য দ্রুত ছাউনি ও বসার ব্যবস্থা করা দরকার।"
ঘাট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে গড়ে ৫০টি নৌকা চলাচল করে এবং প্রতিটি নৌকায় ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকেন। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই ঘাট ব্যবহার করেন। অথচ এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই সুপেয় পানি বা বসার আসন।
চলতি অর্থবছরে চিলমারী নদীবন্দর ঘাটটি প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিপুল রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে যাত্রীসেবার কোনো দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন আহমেদ বলেন, "প্রতিবছর ঘাট থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হচ্ছে। অথচ যাত্রীদের বসার জায়গা নেই, টয়লেট নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। এত বড় একটি ঘাটে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
এদিকে বন্দর উন্নয়নের জন্য নেওয়া প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। জানা গেছে, পাঁচ বছর ধরে চলমান এই প্রকল্পের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৪ শতাংশ।
এই বিষয়ে চিলমারী নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র বলেন, "আলাদাভাবে গণশৌচাগার নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত আপাতত নেই। তবে প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জেটির কাজ শেষ হলে টার্মিনালটি চালু করা হবে এবং তখন যাত্রীরা সব সুবিধা পাবেন। আশা করা হচ্ছে ঈদের আগেই টার্মিনালটি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।"
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুর হাসান বলেন, "চিলমারী নদীবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, আশা করছি খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।"