সুন্দরবনে শিকারিদের ফাঁদে আহত হয়ে দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসার পর বনে অবমুক্ত করা বাঘিনীটির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বসানো ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপিং ক্যামেরার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত বাঘিনীটির ছবি ধরা পড়েনি। তবে অবমুক্ত করার স্থানেই অন্য তিনটি বাঘিনীর বিচরণের ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
বাঘিনীটির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সে বেঁচে আছে কি না, নাকি পুনরায় কোনো বিপদে পড়েছে—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বন বিভাগের দাবি, ক্যামেরায় ছবি না পাওয়ার অর্থই এই নয় যে বাঘিনীটি মারা গেছে। অন্য তিনটি বাঘিনী ওই এলাকায় চলে আসায় সে নিজের বিচরণ এলাকা পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে যেতে পারে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি চাঁদপাই রেঞ্জের বদ্যমারী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন বনে হরিণ শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় তার সামনের বাঁ পায়ে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে পচন ধরে।
বন বিভাগ বাঘিনীটিকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে ওঠে। এরপর গত ১২ জুলাই চাঁদপাই রেঞ্জের আন্দারমানিক এলাকার গভীর বনে (উদ্ধারস্থলের কাছাকাছি) বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়। বন বিভাগ জানিয়েছে, অবমুক্তির পর প্রায় ১৫০ মিটার পথজুড়ে তার পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, খাঁচা থেকে বের হয়ে বনে যাওয়ার সময় বাঘিনীটি কিছুটা দুর্বলভাবে হাঁটছিল। এমনকি দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিল এবং তাকে কয়েকবার পেছনে ফিরে তাকাতে দেখা যায়। অবমুক্তির এক মাস পার হলেও ট্র্যাপিং ক্যামেরায় তার ছবি না পাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে আন্দারমানিক এলাকায় প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটারজুড়ে প্রথমে ২০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপিং ক্যামেরা বসানো হয়। পরে শ্যালনদীর পূর্বপাড় ও জয়মনি এলাকায় আরও ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। বন বিভাগ নিয়মিত এসব ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করলেও অবমুক্ত করা বাঘিনীটির উপস্থিতি মেলেনি, যদিও অন্য তিনটি বাঘিনীর ছবি ধরা পড়েছে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, "বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার পর থেকেই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বনের প্রায় ১৫০ মিটার এলাকাজুড়ে তার পায়ের স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। চেতনানাশক প্রযোগের কারণে অবমুক্তির সময় কিছুটা দুর্বল থাকলেও পরে পাওয়া পায়ের ছাপ দেখে তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "ক্যামেরায় বাঘিনীটির ছবি না পাওয়া মানেই সে মারা গেছে—এমনটা নয়। তার আগের আবাসস্থলে অন্য তিনটি বাঘিনী চলে আসায় সে হয়তো অন্য এলাকায় চলে গেছে। সাধারণত একটি বাঘ ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করে।"
ডিএফও আরও জানান, বাঘিনীটি হয়তো তার বিচরণ এলাকা পরিবর্তন করেছে এবং বর্তমানে ক্যামেরার আওতার বাইরে রয়েছে। তার অবস্থান নিশ্চিত করতে আগামী সপ্তাহে ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরার ফুটেজ আবারও মনিটর করা হবে। পাশাপাশি আন্দারমানিক এলাকাজুড়ে বন বিভাগের নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বাঘিনীটি মারা গেছে—এমন কোনো তথ্য আপাতত বন বিভাগের কাছে নেই।