নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পেরিয়েও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি। খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ব্যস্ত সড়ক, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে গুলি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় মানুষের উদ্বেগও কমছে না। অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মাঠের পুলিশ এখনো পুরো মনোবল নিয়ে কাজে ফিরতে পারেনি বলে পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

সারা দেশে দায়ের হওয়া সাত শ্রেণির মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে—গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত—একই সাত শ্রেণিতে মামলা হয়েছিল ২১ হাজার ২২৮টি। সে অনুযায়ী মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৫২৮টি বা প্রায় আড়াই শতাংশ।

সাত শ্রেণি হলো খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ এবং চুরি। প্রথম তিন শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে; অন্য চার শ্রেণিতে কমেছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া এই হিসাব মূলত মামলার সংখ্যা—নির্দিষ্ট সময়ে সংঘটিত সব অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না বা অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় না। ফলে শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে অপরাধের সামগ্রিক চিত্র টানা কঠিন।

সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মে মাসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে তিনি মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু সরকারের প্রথম ছয় মাসের কাছাকাছি সময়ের অপরাধ পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের চিত্রে প্রত্যাশিত উন্নতি এখনো স্পষ্ট হয়নি।

তবে সরকারের মূল্যায়ন ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সরকারের বিগত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী এটিকে আরও সুসংহত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে ছিনতাই, খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক এবং জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে সারা দেশে খুনের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে ছিল ১ হাজার ৭৮০টি। সে হিসাবে খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। এই শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।

পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ৩১৭টি। আগের ছয় মাসে ছিল ২৭৫টি। অর্থাৎ বেড়েছে ৪২টি।

প্রথম তিন শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে মোট ১ হাজার ১২৬টি। অন্যদিকে ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ এবং চুরির মামলা আগের ছয় মাসের তুলনায় সম্মিলিতভাবে ৫৯৮টি কমেছে। এই চার শ্রেণিতে গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ৮ হাজার ৪৮৫টি, আগের ছয় মাসে হয়েছিল ৯ হাজার ৮৩টি। সব মিলিয়ে সাত শ্রেণিতে নিট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫২৮টি।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির মামলা কমেছে। তবে ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা না হওয়ায় মাঠের পুরো চিত্র পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ঝামেলা মনে করে বা হয়রানির আশঙ্কায় থানায় যান না। আবার কিছু থানা মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে অথবা তদন্তের কথা বলে ‘লিখিত অভিযোগ’ রেখে দেয়। এসব অভিযোগের অনেকগুলো পরে মামলায় রূপ নেয় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো দেখানোর প্রবণতা থেকেও কোনো কোনো থানা মামলা নিতে নিরুৎসাহিত করে। তাঁরা মনে করেন, অপরাধের ঘটনা যথাযথভাবে নথিভুক্ত না হলে অপরাধী আরও উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম ও অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কোনো ঘটনায় মামলা না নিলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে।

পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অপরাধের ধরনও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যা, অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজি, অপহরণের পর হত্যা এবং সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।

গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে। তদন্তে পুরোনো অপরাধী গোষ্ঠীর বিরোধের তথ্য সামনে এলেও হত্যার নির্দেশদাতাকে এখনো শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। গত ১৯ মে পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এর আগে ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আরেক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ড, গোলাগুলি ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মুক্তকণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একের পর এক ঘটনার পরও অনেক পরিকল্পনাকারী ও অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার হয়নি। এতে অপরাধীদের শাস্তি হওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হচ্ছে।

অবৈধ অস্ত্রও আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় ঝুঁকি। ২০২৪ সালের আগস্টে থানা ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। বিভিন্ন অপরাধের তদন্তে অপরাধীদের হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামিনে মুক্তি পাওয়া পুরোনো ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের কেউ কেউ আবার চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার ও হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছেন বলে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব অভিযানে পুলিশ সদস্যদের বাধা ও হামলার মুখেও পড়তে হচ্ছে।

গত ৯ জুন সাভারে মাদক মামলার এক পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের দুই সদস্য হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকেও ছিনিয়ে নেয়। এর এক সপ্তাহ পর ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ দুই পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহত করা হয়।

কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, কোনো কোনো অভিযানের সময় রাজনৈতিক পক্ষগুলো লোকজন জড়ো করে মব তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গিয়েও পুলিশ সদস্যরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। পরিস্থিতি জটিল হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমর্থন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও তাঁদের সংশয় রয়েছে।

পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১০ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁদের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পুরো মনোবল ফিরে না পাওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে তৈরি হওয়া মানসিক আঘাত, দায়িত্ব পালনের সময় হামলা ও বাধা, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সমর্থন নিয়ে সংশয়, রাজনৈতিক চাপ, ঘন ঘন বদলি-পদায়ন এবং চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্য ও স্থাপনায় হামলার ঘটনায় বাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় পুরোপুরি কাটেনি। এখন আইনসিদ্ধ বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক সদস্য সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন।

অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অপরাধ অনেকটা ঢেউয়ের মতো বাড়ে-কমে।’ গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই অবস্থা থেকে বাহিনী ধাপে ধাপে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ নিয়ে অপপ্রচার বাহিনীর স্বাভাবিক হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেলে পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৮ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং পলাতক রয়েছেন ৫৭ জন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়ও দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারে আছেন।

বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৯৭ পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৩ আগস্ট ৫৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা অথবা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে আরও ১৪২ জনকে। পলায়নের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ৯৩ কর্মকর্তা। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ২৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এগুলো আলাদা আইনি ও প্রশাসনিক হিসাব—তালিকাগুলোতে একই ব্যক্তি একাধিকবার আছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাই সংখ্যাগুলো যোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া সদস্যের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।

মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে পড়া পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই অনেক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন না, কারও নাম দায়িত্ব পালনের তালিকায় ছিল না, আবার কেউ ঘটনার সময় অন্য ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। এরপরও তাঁদের আসামি করা হয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও কেউ কেউ মামলার আসামি হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

অন্যদিকে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার হওয়া জরুরি। তবে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করেই আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখন বাহিনীর বাইরে। এতে কোনো কোনো ইউনিটে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তার সংকট তৈরি হয়েছে। উচ্চপর্যায়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেকের দক্ষতার ঘাটতি নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। বাহিনীর ভেতরের অস্থিরতার প্রভাবও পড়ছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ওপর। নেতৃত্বে বা সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে না বসালে বাহিনীর ঘুরে দাঁড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বদলি বা পদায়নের পর তাঁদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার শুরু হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো ছবি ও অতীতের কর্মস্থলের তথ্য ব্যবহার করে রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যাচাইহীন প্রচারের কারণে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনে অনেকে অস্বস্তি ও চাপের মধ্যে পড়েন।

কোনো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি, অপরাধী গোষ্ঠী এবং স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার আগেই বদলি হলে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। আবার দীর্ঘ সময় অপারেশন শাখায় দায়িত্ব পালন না করা কর্মকর্তাদের হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল দায়িত্ব দেওয়া হলে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বেগ পেতে হয়। কর্মকর্তাদের মতে, ঘন ঘন বদলি এবং যথাযথ অভিজ্ঞতা বিবেচনা না করে পদায়ন—দুটিই পুলিশের স্বাভাবিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা তৈরি করছে।

জবাবদিহি ও মনোবল—দুটিই প্রয়োজন বলে মনে করেন পুলিশ সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (সাবেক আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পুলিশের প্রথম কাজ অপরাধ প্রতিরোধ করা। সেখানে ব্যর্থ হলে দ্রুত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করতে হবে। কোনো অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত না করার অর্থ অপরাধীকে উৎসাহিত করা এবং ভুক্তভোগীকে প্রতিকার থেকে বঞ্চিত করা।

আবদুল কাইয়ুমের মতে, পদোন্নতি ও পদায়নে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পুলিশের চেইন অব কমান্ড শক্ত করতে হবে। হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যাচাই ছাড়া কোনো সদস্যকে হয়রানি বা শাস্তি দেওয়া যাবে না।

সাবেক এই আইজিপি বলেন, পুলিশ সদস্যরা ঘুষ, ক্ষমতাসীনদের তোষণ, অসদাচরণ ও মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাহিনীর ভাবমূর্তি ও জনসমর্থন ফিরবে না। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পুলিশের মনোবল ফেরানোর পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানুষের আস্থা অর্জন করাও জরুরি।