রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট সমাধান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ও জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজনে এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, "বর্তমান সরকারকে বলা হচ্ছে এখনো ছয় মাসের শিশু সরকার। কিন্তু ছয় মাসের শিশু থাকা অবস্থায় যদি সরকার চাইত, তাহলে অনেক কিছু করতে পারত। যদি সরকারের মাথায় জনগণ থাকত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান সরকারের নীতিতেও জনস্বার্থ গুরুত্ব পায়নি।"
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সম্পদ জনগণের স্বার্থে ব্যবহার না করে নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি গোষ্ঠী বা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের মুনাফা বাড়ানোর উপযোগী নীতি গ্রহণ করছে। বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট সমাধানে ভোলার নিজস্ব গ্যাস ব্যবহার না করে সরকার চড়া দামে বিদেশি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, "অথচ ভোলায় গ্যাস উত্তোলন, পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত এবং সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দিলে এই সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভব হতো।"
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এবং ফুলবাড়ীর কয়লাখনি চালুর যেকোনো প্রস্তাবকে জাতীয় স্বার্থের বিরোধী দাবি করে তিনি বলেন, "মূলত লন্ডনের শেয়ারবাজারে লাইসেন্সহীন ‘গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট’ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়াতেই এসব কথা বলা হচ্ছে।"
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর প্রতিবাদে জ্বালানি-সংকট সমাধান, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ও জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ বন্ধ, ওষুধের সরকারি মূল্যনিয়ন্ত্রণ কার্যকর এবং মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ ছয় দফা দাবিতে আগামী ২৪ আগস্ট ঢাকা থেকে ফুলবাড়ীর উদ্দেশে ‘প্রচার যাত্রা’ শুরু করবে এবং ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে গণসমাবেশ করবে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
সমাবেশে উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক মাহা মির্জা বলেন, "বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি ও মাফিয়া সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ায় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা আজ চরম ঝুঁকিতে। জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে এবং বাপেক্সকে (তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা) উপেক্ষা করে বিদেশি সংস্থাকে কাজ দিলে কমিশনের চাকা ঘোরে, কিন্তু সংকটের সমাধান হয় না।"
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, "বাপেক্সের সাফল্য আন্তর্জাতিক মানের। তাই দেশীয় সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত নতুন গ্যাসকূপ খনন করাই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায়।"
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, "ভোলায় নিজস্ব গ্যাস পড়ে থাকলেও আমদানিনির্ভর এলএনজিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কম হলেও, চড়া দামের আমদানিকৃত এলএনজির কারণে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, বকেয়া পরিশোধ না করা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে সংকট তীব্র হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় এই সমাবেশে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হারুন–অর–রশিদসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান, অধ্যাপক ফাহমিদুল হক এবং বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা প্রমুখ।