আগস্টের ৩০ তারিখ থেকে টানা দুই সপ্তাহ ইরানকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। প্রথমে কিরগিজস্তানের বিশকেকে অনুষ্ঠিত হবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন এবং পরবর্তীতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে ব্রিকস সম্মেলন। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে ইরানের নেতারা এমন সব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন, যাদের সাথে তেহরানের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। কোন শর্তে এটি সম্ভব হবে, সেটিই এখন প্রধান প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়ে যেত। বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন ও ভারত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের ৪৪ শতাংশ ক্রয় করত। পাশাপাশি তারা বিপুল পরিমাণ এলএনজি ও সার আমদানি করে। জাপানের আমদানি করা তেলের ৯৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৭০ শতাংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের আমদানিও এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বহু দেশের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে।
গত কয়েক মাসে ওয়াশিংটন কখনো শক্তি প্রদর্শন, কখনো অবরোধ এবং কখনো আলোচনার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে চীন ও ভারতসহ কয়েকটি দেশ নীরব কূটনীতির মাধ্যমে ইরানকে সংযত হতে ও আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ, হরমুজ বন্ধ থাকায় জ্বালানি ও পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তাই আসন্ন দুই সম্মেলন সংকট নিরসনে রাজনৈতিক গতি তৈরির সুযোগ দিতে পারে।
তবে ইরানের এশীয় বন্ধুদের ঐক্য খুব একটা মজবুত নয়। চীনের হাতে প্রায় ১৪০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং তারা রাশিয়া থেকে বাড়তি তেল কিনছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনে নতুন গাড়ি বিক্রির ৫৪ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি, যার ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেলের চাহিদা কমেছে। ফলে চীন অপেক্ষা করতে পারলেও প্রণালি খুলে যাওয়া তাদের স্বার্থের অনুকূলে।
রাশিয়ার অবস্থান আরও জটিল। হরমুজ বন্ধ হওয়ায় এশিয়ার ক্রেতারা রুশ তেলের দিকে ঝুঁকেছে, যার ফলে মস্কো আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৯০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় করেছে। চ্যাথাম হাউসের এক গবেষণায় ইরান যুদ্ধকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ‘অর্থনৈতিক উপহার’ বলা হয়েছে, কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তখন রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভারতের। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৫৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে। তাদের তেল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ হরমুজের বাইরে থেকে এলেও আমদানি করা এলএনজির ৯০ শতাংশ আসে এই প্রণালি দিয়ে। বিশকেকের সম্মেলনের ১১ দিন পর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, তাই ভারতের জন্য হরমুজ খোলা চীন বা রাশিয়ার চেয়েও বেশি জরুরি। প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ১৩০-১৪০টি থেকে কমে এক অঙ্কে নেমেছে। ২০২৬ সালের জুনে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি এসেছে রাশিয়া থেকে।
তা সত্ত্বেও চীন, ভারত বা রাশিয়া—কেউই যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানকে প্রণালি খুলতে বাধ্য করার মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। ইরানের অন্য এশীয় বন্ধুদের অবস্থাও প্রায় একই। ফলে সংহতির ছবি যতটা স্পষ্ট, বাস্তব ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ততটা নয়।
এখন পর্যন্ত একমাত্র আশাব্যঞ্জক ঘটনা ছিল এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। এতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্মতি দেন এবং চীনের শেষ মুহূর্তের উদ্যোগও ভূমিকা রাখে। ১৯৭৯ সালের পর প্রথম সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। এরপরও কয়েক দফা চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। মূল অচলাবস্থা হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের মার্কিন দাবি এবং হরমুজ পুনরায় খোলার প্রশ্ন।
চীনের মধ্যস্থতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ নিরাপদ করতে চীনের সহায়তা চেয়েছিলেন, কিন্তু বেইজিং তাতে সাড়া দেয়নি। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেন কার্লসনের মতে, চীন এ সংকটকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সমস্যা হিসেবে দেখে। ইরানও এখন আলোচনার আগে বিভিন্ন শর্ত দিচ্ছে, ফলে সমাধান সহজ নয়।
তবে বাহরাইন, মিসর, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও আলোচনায় থাকবে। এসব দেশ গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনায় ফেরানোর চেষ্টা করেছে। তাই তারা সংকট যেমন জটিল করতে পারে, তেমনি সমাধানের পথও তৈরি করতে পারে।
এখানে ১৯৭১ সালের ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। সে সময় পাকিস্তান হেনরি কিসিঞ্জারকে গোপনে বেইজিং নিয়ে গিয়েছিল, কারণ ইসলামাবাদের তখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল। সেই উদ্যোগ ঠান্ডা যুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। সম্প্রতি পাকিস্তান ভ্যান্স ও গালিবাফকে আলোচনায় বসিয়ে সেই মডেলেরই একটি ছোট সংস্করণ দেখিয়েছে।
বিশকেক ও নয়াদিল্লির সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বিকল্প হতে পারবে না। তবে এগুলো চীন ও ভারতকে উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানানোর সুযোগ দেবে। ভারত ব্রিকসের সভাপতি হিসেবে বিষয়টিকে বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নিজেদের ছাড়কে আত্মসমর্পণ নয়, বরং বহুপক্ষীয় সমঝোতার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। এটিই হতে পারে মুখ রক্ষা করে সংকট থেকে বের হওয়ার বাস্তব পথ।
এটি কোনো শান্তিচুক্তি বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হবে না; বরং হবে উত্তেজনা কমানোর একটি কাঠামো। তবে তা যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে হওয়ার সম্ভাবনা কম। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসের ঐকমত্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা এমন ঘোষণাকে কঠিন করে তুলবে। কাজেই আসল কূটনীতি হতে হবে সম্মেলনের আড়ালে, বন্ধ দরজার পেছনে এবং গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যেমন করেছিল, ২০২৬ সালেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ প্রয়োজন হতে পারে। সংকটের সময়ে প্রকৃত কূটনীতি প্রায়ই মঞ্চে নয়, মঞ্চের বাইরেই সফল হয়।
— লেখাটি নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সরণ সিং-এর। ‘এশিয়া টাইমস’ থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।