প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিকেই পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের চর্চা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বই ছাপা ও বিতরণে নানা জটিলতার কারণে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সব বই সরবরাহ করতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল। আর চলতি শিক্ষাবর্ষে শতভাগ বই সরবরাহ করতে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লেগে যায়।

বই পেতে দেরি হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বছরের শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়। এ কারণে সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বরে আগামী শিক্ষাবর্ষের বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। সরকার পরিচালনার ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা চলতি বছরের শেষেই পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের বই পেয়ে যাবে—এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগামী বছর নতুন চারটি বই যুক্ত করার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে শিক্ষাক্রমে আরও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্র বলছে, ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রম আরও বিস্তৃতভাবে পরিমার্জন করে বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পরিমার্জন করে সীমিত পরিসরে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

এনসিটিবির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কাজ আগেভাগে শেষ করার প্রস্তুতি চলছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পাঠানো, যাতে ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া যায়। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের বলেন, প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপার কাজ আজকালের মধ্যে শুরু হবে। অন্যান্য শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ছাপার কাজও ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শুরু করার আশা করছেন তিনি। তাঁদের লক্ষ্য, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ করা।

এনসিটিবির সূত্রমতে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বইয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সময়মতো ছাপা শেষ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তবে আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দরপত্র, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রণ ও সরবরাহ—সব ধাপ আগেভাগে শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আবার পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ চলায় ইতিমধ্যে বেশ খানিকটা সময় চলে গেছে।

প্রতিবছর বিনা মূল্যের বই ছাপা ও বিতরণের ক্ষেত্রে কাগজের সরবরাহ, দরপত্র-সংক্রান্ত জটিলতা, মুদ্রণ ও সংশোধন, ছাপাখানার সক্ষমতা এবং বই পরিবহনের মতো বিষয়গুলো সময়সূচিতে প্রভাব ফেলে। তাই শুধু ছাপার কাজ শেষ করাই নয়, নির্ধারিত সময়ে বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যুক্ত হচ্ছে চার নতুন বই

জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনসিটিবি সূত্র বলছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হবে।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বই দুটি হলো ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। ‘খেলাধুলা’ বইয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডিসহ আটটি খেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি বইটিতে গুরুত্ব পাবে। ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন ‘আমি ও আমার সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে সংস্কৃতির ধারণা, ব্যক্তিজীবনে সংস্কৃতির প্রভাব, নিজের পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মতো বিষয় রাখা হচ্ছে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হবে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) ’। ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ের মূল লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। আর ‘আনন্দময় শিখন’ বইয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার সঙ্গে আনন্দ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

২০২৮ সালে বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য

আগামী বছর নতুন চারটি বই যুক্ত করার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে শিক্ষাক্রমে আরও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্র বলছে, ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রম আরও বিস্তৃতভাবে পরিমার্জন করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পরিমার্জনের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বই সময়মতো হাতে পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই না থাকলে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। তাই ডিসেম্বরেই বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বছরের শুরু থেকেই পাঠদান নির্বিঘ্ন রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে শুধু সময়সীমা নির্ধারণ করলেই হবে না, বইয়ের মান, নির্ভুল এবং সঠিক সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছেও বই পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।