সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখে স্থবির হয়ে পড়েছে কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। টানা লোকসান ও আর্থিক চাপ সামলাতে এখন বড় ধরনের জনবল ছাঁটাইয়ের কথা ভাবছে অধিকাংশ কারখানা কর্তৃপক্ষ, যা সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

গ্যাস সংকট এবং কার্যাদেশ বা অর্ডার কমে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই শুরু করেছে। সর্বশেষ আশুলিয়ার পুকুরপাড় এলাকার ‘অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেড’ নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানা থেকে একদিনেই ৫৬৫ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। সরকারি ছুটির সুযোগ নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ নোটিশ টাঙিয়ে এবং শ্রমিকদের মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠিয়ে এই প্রক্রিয়া কার্যকর করে।

এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপের একাধিক ইউনিট থেকেও সহস্রাধিক শ্রমিককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া লুসাকা কারখানায় শ্রমিক আন্দোলনের পর প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হলেও সেখান থেকে প্রায় ১৫০ জন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুরো শিল্পাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ছাঁটাই আতঙ্ক।

সাভার ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ (পিএসআই) না থাকা এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন নামমাত্র পর্যায়ে নেমে এসেছে। কারখানা সচল রাখতে জেনারেটরে অতিরিক্ত ডিজেল পোড়াতে গিয়ে পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের ‘অফ-সিজন’ হওয়ায় বিশ্ববাজারে ক্রয়াদেশের ঘাটতি রয়েছে। একদিকে অর্ডারের অভাব এবং অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত সুইং অপারেটর মিলন শেখ বলেন, “ছুটিতে থাকার সময় বা সকালে কারখানায় ঢুকতেই ছাঁটাইয়ের নোটিশ পাব—এই ভয়ে থাকি। ওভারটাইম তো দূরের কথা, মূল বেতন সময়মতো পাব কি না তা নিয়েই দুশ্চিন্তা। মাস শেষে ঘরভাড়া, দোকানের বাকি আর পরিবারের খরচ কীভাবে চালাব তা ভেবে রাতে ঘুম হয় না। গ্যাস বা কারখানার সমস্যা তো আমাদের কারণে নয়, কিন্তু খেসারত সবসময় আমাদেরই দিতে হয়।”

ফিনিশিং সেকশনের শ্রমিক তুহিন বলেন, “কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ বন্ধ থাকে। আবার বিদ্যুৎ আসলে একসঙ্গে দ্বিগুণ কাজ আদায় করা হয়। মাঝে মাঝে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। এত খাটাখাটনির পরও যেকোনো মুহূর্তে ছাঁটাই হওয়ার ভয়। গ্রামে মা-বাবা আর ছোট ভাই-বোন আমার আয়ের ওপর নির্ভর করে। এখন চাকরি গেলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে রাস্তায় বসা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।”

সাভারের এআর ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেড কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সোহাগ হোসেন বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় পরিচালন খরচ না কমালে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে না। তাই বাধ্য হয়েই জনবল কাটছাঁটের কথা ভাবছে অনেক কারখানা।”

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “জ্বালানি সংকট বা ব্যবসায়িক মন্দার বাহানা বানিয়ে হঠাৎ করে একসঙ্গে এত শ্রমিক ছাঁটাই অমানবিক। মালিকপক্ষ কৌশলে অফ-সিজনকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের পেটে লাথি মারতে চাইছে। অবিলম্বে এসব অযৌক্তিক ছাঁটাই বন্ধ না করা হলে ও ছাঁটাইকৃতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না নিলে সাভারে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।”

গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-এর আশুলিয়া জোনের কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন জানান, এলাকাটি মূল সোর্স থেকে দূরবর্তী হওয়ায় সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাসের তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো উন্নতি হয়নি এবং আগের মতোই সংকট বজায় রয়েছে।

অন্যদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা নিয়ে শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “এমন বড় কোনো সিগনিফিকেন্ট ছাঁটাইয়ের তথ্য আমরা পাইনি। বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ও স্বাভাবিক রয়েছে।”