আগের দুটি পর্বে বলা হয়েছে কম্পিটেন্সি বেজড ইন্টারভিউ পদ্ধতি কী। সেখানেই ‘স্টার’ (STAR) মেথড ব্যবহার করে নিজের কাজের উদাহরণ সাজানোর দিকটি আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু ভাইভা বোর্ডের কাছে আরেকটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্ব পায়—প্রার্থীর সত্যবাদিতা এবং মানসিক বুদ্ধিমত্তা।

দেশের সাধারণ বিসিএস প্রার্থীরা অনেক সময় ভাবেন, ভাইভা বোর্ডে বানিয়ে বলা গল্প বললেই কাজ শেষ। কিংবা বাজারের কোনো গাইড বই বা কোচিংয়ে শেখানো তথ্য হুবহু আবৃত্তি করলেই হয়তো বোর্ড সন্তুষ্ট হবে। কিন্তু কম্পিটেন্সি বেজড ইন্টারভিউ পদ্ধতিটিই এমনভাবে সাজানো যে কৃত্রিম বা বানানো উত্তর দ্রুতই ধরা পড়ে।

ভাইভা বোর্ডে ‘অনুপ্রশ্ন’ বা পাল্টা প্রশ্ন কীভাবে কাজ করে
কম্পিটেন্সি বেজড ভাইভায় বোর্ড প্রথম উত্তরে থামে না। আপনি যখন নিজের জীবনের কোনো কাজের উদাহরণ দেবেন, বোর্ড সেই ঘটনার ভেতর থেকে ধরে ধরে আরও গভীর প্রশ্ন করতে থাকবে। উদাহরণ হিসেবে—আপনি যদি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে স্পন্সর পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি নিজে উদ্যোগ নিয়ে কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে ফান্ড এনেছিলাম।’

বোর্ড এখান থেকেই পরপর প্রশ্ন সাজিয়ে নিতে পারে, যেমন—
‘কোন কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনি কথা বলেছিলেন?’
‘তাদের মধ্যে কোন প্রতিষ্ঠানটি প্রথম রাজি হয়েছিল?’
‘আপনি যখন কাজের প্রস্তাব পেশ করলেন, তারা প্রথমে কী আপত্তি জানিয়েছিল?’
‘সেই আপত্তি সামলাতে আপনি ঠিক কী যুক্তি দিয়েছিলেন?’

ঘটনাটি যদি সত্যি আপনার নিজের অভিজ্ঞতা হয়, তবে সব প্রশ্নের উত্তর স্বাভাবিকভাবেই দিতে পারবেন। আর বিষয়টি যদি কোনো কোচিং সেন্টারের শিট থেকে মুখস্থ করা হয় বা পুরোটা সাজিয়ে বলা হয়, তবে পরের প্রশ্নগুলোতে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কম্পিটেন্সি বেজড ইন্টারভিউর মূল শক্তিটাও এখানেই—প্রার্থীর উত্তরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসত্য বা অসংগতি তুলনামূলকভাবে সহজে বেরিয়ে আসে।

ভুল স্বীকার করা কি দুর্বলতা
অনেকের ধারণা, ভাইভা বোর্ডে কেবল সাফল্যের গল্পই বলা উচিত। নিজের ভুল স্বীকার করলে হয়তো নম্বর কমে যাবে। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। কম্পিটেন্সি বেজড ভাইভায় প্রায়ই এমন প্রশ্ন করা হয়:
‘আপনার জীবনের এমন একটি অভিজ্ঞতার কথা বলুন, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একটি কাজ নষ্ট হতে বসেছিল। আপনি পরিস্থিতিটি কীভাবে সামলেছিলেন এবং কী শিখেছিলেন?’

এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য প্রার্থীর যোগ্যতাকে ছোট করা নয়। বরং বোর্ড দেখতে চায় প্রার্থী নিজের ভুল নিজে বুঝতে পারেন কি না। একই সঙ্গে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা আছে কি না, সেটিও বিবেচনায় আসে।

এখানে বাণিজ্যমুখী নোটের শেখানো কৃত্রিম কথার চেয়ে নিজের জীবনের একটি ছোট ভুল সৎভাবে স্বীকার করাই বেশি গ্রহণযোগ্য।

যেমন—বলতে পারেন
‘একবার কাজের চাপ বেশি থাকায় আমি দলের এক সহকর্মীকে ইভেন্টের সময়সূচি নিশ্চিত করার কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলে অনুষ্ঠানে সামান্য ঝামেলা তৈরি হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করি এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিই। এরপর থেকে আমি কাজের তালিকা বা ‘চেকলিস্ট’ ব্যবহার করা শুরু করি, যাতে ভবিষ্যতে এই ভুল আর না হয়।’

এই ধরনের উত্তর শুনে ভাইভা বোর্ড প্রার্থীর সততা এবং দায়িত্ব নেওয়ার মনোভাবটি বুঝতে পারে। পাশাপাশি ভুল থেকে শেখার মানসিকতাও স্পষ্ট হয়—একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

কোচিংয়ের শিট নাকি নিজের অভিজ্ঞতা
বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষার্থীরা ভাইভার প্রস্তুতির জন্য বাণিজ্যমুখী কোচিং সেন্টারের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করছেন। সেখানে প্রায় একই ধরনের উত্তর, একই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং কাল্পনিক গল্পের চর্চা দেখা যায়। ফলে বোর্ডের সামনে বহু প্রার্থীর উত্তর একরকম শোনায়। বোর্ডের অভিজ্ঞ সদস্যরা কয়েক মিনিট কথা বললেই বুঝতে পারেন, প্রার্থী নিজের কথা বলছেন নাকি কোনো শিটের পড়া মুখস্থ বলছেন।

কম্পিটেন্সি বেজড ইন্টারভিউর মূল উদ্দেশ্যই হলো এই কৃত্রিম চর্চাকে পেছনে ফেলে প্রার্থীর আসল অভিজ্ঞতা বের করে আনা। এই পদ্ধতিতে মুখস্থ করার সুযোগ সীমিত। নিজের জীবন খুব সাধারণ হলেও, আপনি যদি আপনার কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা সৎভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, তবে তা মুখস্থ উত্তরের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

প্রার্থীরা নিজের প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন?
যে ঘটনাগুলো ভাইভা বোর্ডের জন্য নির্বাচন করছেন, সেগুলোর ওপর নিজেকেই জেরা করার অনুশীলন করুন।

ছোট ছোট প্রশ্ন করে উত্তর তৈরির চেষ্টা করুন:
ঘটনাটির প্রতিটি ধাপ আপনার স্পষ্ট মনে আছে তো?
সেই ঘটনায় আপনার নিজস্ব কোনো ভুল বা সীমাবদ্ধতা ছিল কি?
সেই ঘটনা থেকে আপনি পরবর্তী সময়ে কী শিখেছেন?

মনে রাখবেন, সরকারি পদে অসাধ্য সাধন করা মানুষকে খোঁজা হয় না। সেখানে এমন একজন মানুষকে খোঁজা হয় যিনি বাস্তববাদী, সৎ এবং দায়িত্ব নিয়ে শিখতে প্রস্তুত।