বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসে নাট্যকার সেলিম আল দীনের গভীর গ্রহণযোগ্যতা ও অর্জনের প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ ও ভারতে সম্পন্ন হওয়া বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায়। সম্প্রতি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে জমাকৃত একটি অভিসন্দর্ভের গ্রন্থরূপ প্রকাশিত হয়েছে। অ্যাডামাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. কৌষেয়ী ব্যানার্জী রচিত ‘নাট্যকার সেলিম আল দিন: সৃজন ও ভাবনার স্বাতন্ত্র্য’ গ্রন্থটি সেলিম আল দীনের নাট্যদর্শন ও অনন্য সৃষ্টিশীলতার এক গভীর ও মননশীল পাঠ। কলকাতার ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ’ থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থে গবেষক ইউরোপীয় নাট্যরীতির প্রথা ভেঙে সেলিম আল দীনের দেশজ ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পরীতি ও লোকজীবনের শিকড়সন্ধানী নাট্যভাবনাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তথ্যভিত্তিক অভিসন্দর্ভের কাঠামোর বাইরে পাঠকগ্রাহ্য ও প্রাঞ্জল গদ্যে রচিত এই বইটি নাট্যকারের নিরীক্ষাধর্মী যাত্রাপথকে উন্মোচিত করেছে, যা বাংলা নাট্যসাহিত্যে তাঁর অবদান মূল্যায়নে একটি প্রামাণ্য ও অপরিহার্য আকর-গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।

গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ও কাঠামোগত গভীরতা স্পষ্ট হয় লেখকের ‘নিবেদন’ এবং সূচিপত্র পর্যালোচনায়। ড. মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণা এবং সেলিম আল দীনের ‘কেরামতমঙ্গল’ ও ‘হরগজ’ নাটক পাঠের মাধ্যমে ড. কৌষেয়ী ব্যানার্জী এই নাট্যকারের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীতে অধ্যাপক অরুণ সেনের সহায়তা, বাংলাদেশে সরেজমিন তথ্যসংগ্রহ এবং সরাসরি নাট্যপ্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে তিনি গবেষণার মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলেন। বইটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যধারার ঐতিহাসিক পটভূমি, সেলিম আল দীনের জীবন-আলেখ্য, নাট্যবিষয়, আঙ্গিকগত নিরীক্ষা ও নান্দনিক মূল্যায়নের পাশাপাশি নির্দেশিত নাটকের তালিকা এবং সমৃদ্ধ গ্রন্থপঞ্জি সন্নিবেশিত হয়েছে।

বইয়ের একটি অধ্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যধারার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিকাশ বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নাট্যাঙ্গন শুরু হলেও ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধই ছিল আধুনিক বাংলা নাটকের প্রধান প্রেরণা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নুরুল মোমেন, সিকান্‌দার আবু জাফর, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, মুনীর চৌধুরী ও সাঈদ আহমেদের মতো নাট্যকারেরা পাশ্চাত্য রীতির পাশাপাশি দেশজ উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তবে ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’ এবং পরবর্তীকালে ‘গ্রাম থিয়েটার’-এর মাধ্যমে সেলিম আল দীন ও নাসির উদ্দীন ইউসুফের হাত ধরে বাংলা নাটকে প্রকৃত আমূল পরিবর্তন আসে।

দেশজ ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্বের প্রয়োগে সেলিম আল দীন নাট্যচর্চাকে এক স্বকীয় পরিচয় দান করেন। গবেষক নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন যে, নাট্যকার তাঁর আঙ্গিক নির্মাণে এই শিল্পতত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন। তবে লেখক উল্লেখ করেছেন, অনেকে না বুঝে তাঁকে এই তত্ত্বের ‘জনক’ বলে ভুল অভিধা দেন, যা তাঁর প্রকৃত অবদানকে সংকুচিত করার শামিল।

‘সেলিম আল দীনের জীবনকথা ও সৃজন ব্যাপ্তি’ অধ্যায়ে তাঁর জীবন-আলেখ্য, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নাট্যচর্চার বিবর্তন উঠে এসেছে। লেখকের বিশ্লেষণে, শৈশবের অভিজ্ঞতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা নাট্যকারের মানসিক ভুবন গঠনে প্রভাব ফেলে। যুদ্ধোত্তর ট্রমা ও আর্থসামাজিক অস্থিরতার পটভূমিতে তিনি পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে বাঙালির লৌকিক ঐতিহ্য ও ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্ব অনুসরণে ব্রতী হন। ‘ঢাকা থিয়েটার’ ও ‘গ্রাম থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলা নাটকে এক মহাকাব্যিক ও দেশজ রূপকল্প প্রতিষ্ঠা করেন। কৌষেয়ী ব্যানার্জীর মতে, “সেলিম আল দীন প্রচলিত নাট্যরীতির প্রথাগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি ভেঙে বাঙালি জীবনের লৌকিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে নাট্যচর্চা শুরু করেন।”

লেখকের বিশ্লেষণে নাট্যকারের জীবনবোধ ও মূল্যায়ন চারটি প্রধান ধারায় বিভক্ত। প্রথমত, পাশ্চাত্য ও অ্যাবসার্ড রীতির বদলে দেশজ ও প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক লৌকিক ধারায় আত্মনিয়োগ। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুকে কেবল অবসান নয়, বরং ইহলৌকিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি ও আত্মিক রূপান্তরের অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন। তৃতীয়ত, পৌরাণিক চরিত্র ও মনসামঙ্গলভিত্তিক গল্পকে আধুনিক জীবনের সংকটে নতুনভাবে ব্যাখ্যা। চতুর্থত, মান্দাইয়ের মতো প্রান্তিক মানুষ ও নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সংকটকে নাটকের কেন্দ্রে আনা।

গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে ‘আঙ্গিকগত নিরীক্ষা ও প্রয়োগ সাফল্য’ শিরোনামে ড. কৌষেয়ী ব্যানার্জী দেখিয়েছেন, সেলিম আল দীনের নাটক কেবল পাঠযোগ্য নয়, বরং মঞ্চেও অসাধারণ সফল। প্রথাবিরোধী দেশজ আখ্যানের কারণে শুরুতে সংশয় থাকলেও দ্রুত তা জনপ্রিয় হয়। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা থিয়েটারের ‘শকুন্তলা’ নাটকের ১২৪টির বেশি প্রদর্শনী এবং ১৯৮০ সালে এর শততম মঞ্চায়নে দর্শকের ব্যাপক আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৮৫ সালে কলকাতার নন্দীকারের উৎসবে ‘কীত্তনখোলা’ ও ‘কেরামতমঙ্গল’ এবং ১৯৯৪ সালের পদ্মা-গঙ্গা উৎসবে ‘যৈবতী কন্যার মন’ ও ‘হাত হদাই’ সমাদৃত হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টিয়ক থিয়েটারে ‘চাকা’ নাটকের ইংরেজি রূপান্তর প্রশংসিত হয়। ‘নিমজ্জম’-এর মতো মহাকাব্যিক আখ্যানকে আড়াই ঘণ্টার নাটকে রূপ দেওয়া এবং ‘প্রাচ্য’ ও ‘হরগজ’-এর সফল প্রযোজনা তাঁর প্রয়োগ-সাফল্য প্রমাণ করে। লেখক স্পষ্ট করেছেন, সাধারণ ইতিহাসকাররা ১৭৯৫ সালে লেবেদেভ প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’ থেকে বাংলা নাটকের সূচনা মনে করলেও, সেলিম আল দীন প্রমাণ করেছেন যে ৬৫০ (বা ৭৫০) খ্রিষ্টাব্দ অর্থাৎ প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকেই বাংলা নাটকের নিজস্ব ঐতিহ্য বিদ্যমান।

সেলিম আল দীনের নাট্যগবেষণার মূল্যায়নে লেখক দেখিয়েছেন, তাঁর ‘মধ্যযুগের বাংলা নাট্য’ গবেষণায় চর্যাপদের নাট্য-প্রসঙ্গ, নাট্যগীত, পাঁচালি, ধামালী, মঙ্গলকাব্য, কীর্তন, যাত্রা ও লোকনাট্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ রয়েছে। ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম থিয়েটারের অন্ধ অনুকরণ ভেঙে নিজেদের ঐতিহ্য ও দেশজ উপাদানের মাধ্যমে প্রকৃত নাট্যশিল্প গড়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কৃত্রিম বিভাজন দূর করে এমন এক শিল্পরীতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা স্বদেশে খাঁটি এবং বিশ্বদরবারে গ্রহণযোগ্য। ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘চাকা’ কিংবা ‘বনপাংশুল’-এর মতো নাটকে পাঁচালি ও কথানাট্য রূপক ফিরিয়ে এনে তিনি ঐতিহ্যকে আধুনিক মঞ্চে নতুন জীবন দিয়েছেন। লেখকের মতে, এই গবেষণা বাংলা নাট্যধারাকে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্ত করে নিজস্ব শিকড় খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

গবেষক ড. কৌষেয়ী ব্যানার্জী দুর্গাপুরে বেড়ে উঠেছেন এবং শৈশব থেকেই রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্যে তালিম নিয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলা নাটক নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও প্রাঞ্জল বিশ্লেষণের মাধ্যমে রচিত এই গ্রন্থটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।