রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন—এ অবস্থাতেই তাঁর বুকে গুলি করে পুলিশ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি হিসেবে ওই ফুটেজের প্রথম সম্প্রচার হয় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবল চাপের মধ্যে কীভাবে ওই দৃশ্য এনটিভিতে প্রচার করা সম্ভব হয়েছিল—সেই বর্ণনা উঠে আসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে এনসিপি–সংশ্লিষ্ট ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফকরুল আলম (কাঞ্চন) এ প্রসঙ্গে কথা বলেন। অনুষ্ঠানে এনটিভির রংপুরের স্টাফ ক্যামেরাপারসন আসাদুজ্জামান আরমান এবং টেলিভিশনটির রংপুরের সিনিয়র স্টাফ করেসপনডেন্ট এ কে এম মঈনুল হকও উপস্থিত ছিলেন।

আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার সেই দৃশ্য এনটিভিতে প্রচারের গল্প বলতে গিয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘জুলাই বেদনার স্মৃতিতে ভরা। কারণ, যেদিন মুক্তকণ্ঠতে ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়, সেদিন বিভিন্ন টেলিভিশন দুজনের মৃত্যুর খবর প্রচার করেছিল। আমাদের কাছে অনেক ফুটেজ থাকলেও দেখানো সম্ভব হয়নি। আবু সাঈদকে যেদিন শহীদ করা হয়, সেদিন রানডাউনে (বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে) তিনি ছিলেন।’

আন্দোলনের সময় সংঘাত-সংঘর্ষের খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে ফকরুল আলম বলেন, ‘১৬ জুলাই সংবাদ চলাকালে আমরা দুটি জায়গা থেকে লাইভ করি। প্রথমে বরিশালে সংঘর্ষের ঘটনার লাইভ প্রচারিত হয়। এরপর কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে রংপুরে লাইভে চলে গেলাম। আরমান (পাশে থাকা) সেদিন স্পটে ছিলেন। তিনি সেদিনের সুপার হিরো। মঈনুলও ছিলেন। ক্যামেরা নিয়ে দুঃসাহসী কাজটি করেছিলেন আরমান।’

শুধু এনটিভিই আবু সাঈদকে গুলি করার সেই দৃশ্য লাইভে প্রচার করেছিল বলে উল্লেখ করে এনটিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ ব্যবস্থাপক ফকরুল আলম বলেন, ‘লাইভের পর আমরা নিউজরুমে হতভম্ব হয়ে পড়ি, হাত-পা কাঁপছিল। কারণ, আমি জানতাম এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এরপর অনেক কিছু হলো—নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ, গোয়েন্দা, সরকারি কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ ও জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের অনেক প্রশ্ন।’

সে সময় জেলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে কীভাবে রেহাই পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেদিন গোয়েন্দাদের বলেছিলাম—এ রকম একটি ঘটনা ঘটবে আমি তো জানি না, সংঘর্ষের ঘটনা দেখে লাইভে গিয়েছিলাম, আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে, পুলিশ তাঁকে গুলি করবে—তা আমরা জানতাম না। এ কথা বলে সেদিন রেহাই পেয়েছিলাম।’

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সংবাদ সংগ্রহ করা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা–প্রাপ্তি নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেন। তাঁদের অধিকাংশই জুলাইতে নিজেদের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করেন। কেউ কেউ অভ্যুত্থানের পর চাকরিচ্যুতির ঘটনাও উল্লেখ করেন। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি বলে কারও কারও হতাশাও প্রকাশ পায়।

ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘জুলাইয়ে যাঁরা যাত্রাবাড়ী-রামপুরার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ফুটেজ নিয়েছেন, মোবাইলকে যাঁরা অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন, গুলির পাশে দাঁড়িয়ে জুলাইকে লিপিদ্ধ করা সেই সাংবাদিকদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বড়। আর যাঁরা জুলাইয়ের বিপক্ষে ছিলেন, ইতিহাস তাঁদের অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে।’

অভ্যুত্থানের পর কৌশলে কিছু মানুষের সুবিধা পাওয়া আর অন্যদের বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও ওঠে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদের বক্তব্যে। ঘৃণার সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের অ্যাসাইমেন্ট এডিটর মাকসুদ উন নবী জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংবাদ প্রচারে বিভিন্ন সংস্থার বাধার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাওয়ায় অনেক ছাত্র-জনতা সাংবাদিকদের মেরেছিল।’

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব অনুষ্ঠানে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়ায় তাঁকে টার্গেট করা হয়েছিল। ২৬ জুলাই তাঁর অফিসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে তুলে আনতে গেলে অফিসে ঢুকে তাঁর ব্যবহৃত কম্পিউটার ভাঙচুর ও নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করা হয়। মালিক–সম্পাদককে চাপ দিয়ে তাঁকে র‌্যাবের হাতে তুলে দিতে বলা হলেও সম্পাদক দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে তাঁকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন—এ কথাও জানান তিনি।

বর্তমানে কালের কণ্ঠে কর্মরত জাহিদুল ইসলাম জানান, অভ্যুত্থানের সময় তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে কাজ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন সাংবাদিকেরা।

বর্তমানে দৈনিক আগামীর সময়ের স্টাফ রিপোর্টার আমজাদ হোসেন (হৃদয়) বলেন, অভ্যুত্থানের সময় তিনি দেশ রূপান্তর পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ছিলেন। আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন, ৯ দফা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুজব ডিবাঙ্ক (উন্মোচন) করতে ভূমিকা রাখার কথাও বলেন তিনি।

অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মুজাহিদ (মাহি) জানান, সে সময় ‘কঠিন সেন্সরশিপে’ আবদ্ধ থাকার অভিজ্ঞতা ছিল।

এখন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে চাকরিচ্যুত বেলায়েত হোসেন নিজের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের কাছে প্রশ্ন রাখেন, দায়িত্বে থাকার সময় জুলাইয়ে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদের সঙ্গে বসার কোনো তাড়না তাঁর ছিল কি না।

দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর অনেক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে মালিকানা পরিবর্তন বা রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স শিফট হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি পীড়ার কারণ হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে নিউ এজের নির্বাহী সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত (কল্লোল), ডেইলি স্টারের জিনা তাসরিন, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কামরুজ্জামান বাবলু, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক জুমাতুল বিদা, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক তৌহিদ হায়দার, এখন টিভির মাহমুদ রাকিব, যমুনা টিভির আহমেদ রেজা ও লামিয়া তিথি বক্তব্য দেন।