ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টের রায় আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) ঘোষণা করা হবে। গত ২০ আগস্ট শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য এই দিন ধার্য করেন। নুসরাতের পরিবার আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছে।

নুসরাত হত্যা মামলার বাদী ও নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, “আমরা আদালতের কাছে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করছি। আমরা আমাদের বোনকে হারিয়েছি। আশা করছি রাষ্ট্র এর ন্যায় বিচার করবে। আর আমরা আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করছি। আমাদের বাড়িতে এখনো পুলিশ পাহারা আছে। এরপর আমরা ভয়ের মধ্য আছি। আমরা এত দিন পুলিশি নিরাপত্তায় ছিলাম, এ জন্য প্রশাসনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

নুসরাতের মা শিরিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সাত বছর আগে আমি আমার বুকের মানিককে হারিয়ে ফেলেছি। আমার মেয়ে হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে উপযুক্ত বিচার পেয়েছি। আশা করছি উচ্চ আদালতেও উপযুক্ত বিচার পাব। আর কারও মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়।”

হাইকোর্টের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সোনাগাজীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মেজো মৌলভি বাড়িতে একটি বিশেষ পুলিশ টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল হাসিম নুসরাতের বাড়ি পরিদর্শন করে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দেশের আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আমরা তার গ্রামের বাড়িতে নিরাপত্তার জোরদার করেছি। মামলার রায়কে কেন্দ্র করে যাতে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এ বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। রায়ের পরও পুলিশ পরিবারটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে।”

নিম্ন আদালতে নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাজু মুক্তকণ্ঠকে জানান, “নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ড দেশের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এই মামলার আজ রায় ঘোষণা করতে চলেছেন। আশা করছি নিম্ন আদালতে যেসব ভুল-ত্রুটি ছিল, উচ্চ আদালত তা সংশোধন করে ন্যায়বিচার প্রদান করবেন। প্রকৃত আসামিরা যাতে শাস্তি পান, সে দাবি করছি।”

সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জয়নাল আবদীন বাবলু মুক্তকণ্ঠকে জানান, “নুসরাত হত্যাকাণ্ড দেশের একটি আলোচিত ঘটনা। সোমবার হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হবে বলে জানতে পেরেছি। আমরা চাই যারা প্রকৃত দোষী, তাদের শাস্তি হোক। এ ঘটনায় নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, এ প্রত্যাশা থাকবে।”

এর আগে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার সব নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক ছাপানোর কাজ শেষ করা হয়। প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি শুনানির জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করেন।

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। এ ছাড়া আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেছেন।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়। একই বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান। মামলার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করার পর তা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল মামলা করেন। এ মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর দিন ধার্য করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা হয়।

একই বছরের ২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। আসামিরা হলেন—সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), সাবেক কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

এদিকে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফেনীর সোনাগাজীতে রাফির বাড়িতে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মেজো মৌলভী বাড়িতে নুসরাতের পরিবারের সুরক্ষায় বর্তমানে সাত সদস্যের একটি বিশেষ পুলিশ টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।