জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও সমাবর্তন হয়েছে মাত্র একবার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালে। এরপর ছয় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দায়িত্ব গ্রহণের পর সমাবর্তন আয়োজনের বিষয়টি নতুন করে আবার আলোচনায় এসেছে। ২১ আগস্ট তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি ও সময়সূচির সঙ্গে সমাবর্তন আয়োজনের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত থাকায় নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাবর্তন নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করেছেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, এসব শিক্ষাবর্ষের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরসহ বিভিন্ন ডিগ্রিধারী প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থী দ্বিতীয় সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সমাবর্তন আয়োজনের জন্য আচার্যের অনুমোদন ও সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে সময় পাওয়া গেলে ভেন্যু, অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের তালিকা, সনদ প্রস্তুত, গাউন-টুপি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার কাজ শুরু করা যাবে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছিল, রাষ্ট্রপতির সময়সূচি পাওয়ার পর দ্রুত সমাবর্তনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর পর ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠে আয়োজিত ওই সমাবর্তনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রায় ১৯ হাজার গ্র্যাজুয়েট অংশ নেন। বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা ওই সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

এরপর দ্বিতীয় সমাবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা আর আয়োজন করা হয়নি। ২০২২ সালেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় সমাবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানা গিয়েছিল। তখন ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ডিগ্রিধারীদের নিয়ে সমাবর্তন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ হওয়ায় সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত সাত শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হবেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীরাও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার।

শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ প্রান্তে সমাবর্তন তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সনদ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এটি শিক্ষাজীবনের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। তাই বছরের পর বছর সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশাও তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, পড়াশোনা শেষ করার পর অনেকেই চাকরি ও উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন। কেউ কেউ বিদেশেও অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় পর সমাবর্তন হলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে ক্যাম্পাসে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও একটি যোগসূত্র তৈরি হবে।

সমাবর্তন না হলেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর থেকে মূল সনদ সংগ্রহ করতে পারেন। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সমাবর্তনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ গ্রহণের সুযোগ না থাকায় তাঁদের মধ্যে একধরনের অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাঁরা শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে দীর্ঘদিন ধরে কর্মজীবনে আছেন, তাঁরাও সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী তানজীদ মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ স্বপ্নগুলোর একটি হচ্ছে সমাবর্তনে অংশ নেওয়া। শুধু গাউন-টুপি পরে ছবি তোলার বিষয় নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের স্বীকৃতির সঙ্গে জড়িত। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত দ্বিতীয় সমাবর্তনের উদ্যোগ নিক।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমাবর্তনের সিদ্ধান্ত হলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল যাচাই, সনদ প্রস্তুত ও অন্যান্য একাডেমিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ শুরু করবে।

বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন এ বছরের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয়ের অষ্টম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার কথা জানিয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত থাকায় তাঁর সময়সূচিকে গুরুত্ব দিতে হয়। প্রাথমিকভাবে আগামী বছরের ৩০ জানুয়ারি দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে যথাসময়েই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হবে। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে এই তারিখ পরিবর্তিত হতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাসময়েই সমাবর্তন আয়োজনের সার্বিক প্রচেষ্টা থাকবে।

দ্বিতীয় সমাবর্তনের ক্ষেত্রে এখন তাই মূল অপেক্ষা রাষ্ট্রপতির সময়সূচি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগের। প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে বড় পরিসরে সমাবর্তন আয়োজন করতে হলে ভেন্যু, নিরাপত্তা, সনদ প্রস্তুত, নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন কবে হবে—এখন সেটিই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রধান আগ্রহ।