লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে ইউরোপের দেশ গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টার সময় খাদ্যাভাবে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণের মৃত্যুর সাড়ে চার মাস পর আবারও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অবৈধপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়ে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় সুনামগঞ্জের অন্তত ৮ জন যুবক নিখোঁজ রয়েছেন বলে রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় অনেকের দাবি, সাগরেই ওই যুবকদের মৃত্যু হয়েছে এবং তাদের দেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিখোঁজ যুবকদের পরিবারগুলোতে এখন শোকের মাতম চলছে, যদিও স্বজনরা জীবিত পাওয়ার আশায় চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।

নিখোঁজ ৮ জনের মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৫ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ২ জন এবং দিরাই উপজেলার ১ জন রয়েছেন। তারা হলেন—শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা শত্রুমর্দনের গ্রামের হৃদয় পাল (২০), চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন (২৪), রিপন মিয়া (২৩), মামুন খাঁন (২২), রনসী গ্রামের মো. তালহা (২৫), জগন্নাথপুর উপজেলার বাগময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু (২৩), গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহ (২৫) এবং দিরাই পৌর এলাকার ঘাগটিয়া গ্রামের সানোয়ার হোসেন (২৬)।

নিখোঁজ যুবকদের স্বজন ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে মানবপাচারের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিশ্রুত কাঠের নৌকার বদলে ঝুঁকিপূর্ণ প্লাস্টিকের বোটে ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ যাত্রী তোলার অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মানবপাচারকারী দালাল চক্রের ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে অনেক পরিবারই প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছেন না। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারী চক্রের সদস্যরা রবিবার রাতে নিখোঁজদের কোনো কোনো পরিবারকে ফোন করে দাবি করেছে যে তাঁদের সন্তানরা নিরাপদে রয়েছে এবং এই বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ না খুলতে সতর্ক করে দিয়েছে।

নিখোঁজ মামুন খানের ভাতিজা আব্দুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমার চাচাকে গ্রিসে নিয়ে যাওয়ার চুক্তি করেছিল সুলতানপুরের আল আমিন দালাল। কথা ছিল নিরাপদ কাঠের নৌকায় তাদের পাঠাবে। কিন্তু ২৫ জনের ধারণক্ষমতার বোটটিতে একসংগে ৪২ জনকে প্লাস্টিকের বোটে তুলে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত যাত্রী ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এই অঘটন ঘটেছে। গত ১৫ দিন ধরে চাচার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। আমরা এই প্রতারক দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যাতে আর কেউ এভাবে নিঃস্ব না হয়।"

চিকারকান্দি গ্রামের নিখোঁজ রিপন মিয়ার বাবা রাজ মিয়া জানান, প্রথমে ছেলের বিষয়ে নানা নেতিবাচক খবর শুনলেও পরে গত রাতে তিনি জানতে পেরেছেন তার ছেলে নিরাপদ আছে। তবে এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি। এ সময় তার পাশে থাকা কয়েকজন স্থানীয় যুবক রিপনের বাবাকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেন।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল চাকমা বলেন, "চিকারকান্দি গ্রামের রিপন মিয়াসহ মোট ৫ জন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের পাশাপাশি আমরা প্রশাসনিকভাবে সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছি।"

জানা যায়, গত জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকজন যুবক দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়া পৌঁছান। এরপর গত ৩ আগস্ট রাতে তারা নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হন। যাত্রার দিন বা তার আগে স্বজনদের সাথে তাদের শেষ কথা হয়; এর পর থেকে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা করা নৌকাটিতে থাকা ৪২ জন যাত্রীর মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। মাঝপথে বোটের ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং খাবার ও পানি ফুরিয়ে যাওয়ায় ভূমধ্যসাগরেই ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।

মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল করিম পুলিশ ও গণমাধ্যমকে জানান, তীব্র পানিশূন্যতা ও অনাহারে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে মরদেহে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

চিকারকান্দি গ্রামের মো. সালমান মিয়া বলেন, "আমাদের গ্রাম থেকে ৩ জন লিবিয়া গিয়েছিল। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তাদের কোনো বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার ও বন্ধুবান্ধব সবাই চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।"

পাগলা শত্রুমর্দনের গ্রামের নিখোঁজ হৃদয় পালের কাকা কানন পাল জানান, হৃদয়ের সাথে গত ৩১ জুলাই শেষ কথা হয়েছিল। সে জানিয়েছিল ৩ আগস্ট বোটে উঠবে। সেদিন ২টি নৌকা রওয়ানা দিয়েছিল এবং হৃদয় ২ নম্বর নৌকায় ছিল বলে ১ নম্বর নৌকার এক যাত্রী মারফত নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে ১০ দিন ধরে তারা সাগরে ভাসছিল। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, "মিশরে অনেকের খোঁজ মিললেও আমার ভাতিজার কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। সে কোথায় কীভাবে আছে, আমরা তা জানতে চাই।"

নিখোঁজ মামুন খাঁনের চাচা তফাজ্জল খান বলেন, "গত ৩ আগস্ট মামুন শেষবার ফোন করে জানিয়েছিল তারা গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা দিচ্ছে। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ নেই, আমরা চরম অনিশ্চয়তায় আছি।"

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, "তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে সুনামগঞ্জের কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের তথ্য আমরা পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর জানা যায়। বিষয়টি নিয়ে জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালকের মাধ্যমে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রকৃত তথ্য উদঘাটন ও যাচাইয়ের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনও সরজমিনে নজর রাখছে।"

এর আগে গত ২৮ মার্চ লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ছাতক, জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ১২ তরুণের সলিলসমাধি ঘটেছিল। ওই ঘটনায় তৎকালীন সময়ে জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।