জুলাই ২০২৪-এর সেই উত্তাল দিনগুলো খুব বেশি দূরে নেই, তবে সময়ের আবর্তে যেন সেই স্মৃতিগুলোর ওপর ধুলো জমতে শুরু করেছে। বর্তমান বাংলাদেশকে বুঝতে হলে জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। কারণ, ওই কয়েক সপ্তাহে কেবল একটি সরকারই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি, বরং ঘটেছিল আরও গভীর কিছু। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, দীর্ঘদিনের অসম্ভবগুলোও সম্ভব। ভয় ছাপিয়ে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং প্রচলিত নিয়মগুলো আর অটল মনে হচ্ছিল না।

কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, বরং কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই জীবিকার অনিশ্চয়তা, বৈষম্য আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়। আবু সাঈদের পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, রিকশাওয়ালার স্যালুট, সন্তানের ভিডিও করা মায়ের সতর্কবার্তা কিংবা ছাত্রদের দেখে গর্বিত শিক্ষকের মতো ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এই দৃশ্যগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, ফলে পুলিশি দমন-পীড়নের খবরগুলো আর গোপন রাখা সম্ভব হয়নি। মনে হয়েছিল, ভয় আর নীরবতার পুরোনো নিয়মটি ভেঙে গেছে।

তবে জুলাইকে কীভাবে মনে রাখা হবে, তা নিয়ে এখন টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ভিডিওতে আবু সাঈদের সেই পরিচিত দৃশ্য, কোটা আন্দোলনের পটভূমি, শিক্ষার্থীদের দাবি কিংবা রক্তপাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থান পায়নি। এটি কেবল একটি ভিডিওর কথা নয়, বরং একটি জাতি তার অস্বস্তিকর ইতিহাসকে কীভাবে মনে রাখে, সেই প্রশ্নটিই সামনে এসেছে। অনেক সময় সত্যকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে কেবল কিছু দৃশ্য বা নাম সরিয়ে দিয়ে ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। জুলাইয়ের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটতে শুরু করেছে।

দেশের বাইরেও জুলাইয়ের ভিন্ন বয়ান তৈরি হচ্ছে। দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের মন্তব্যে এই আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-জনতার লড়াইয়ের বদলে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাষ্ট্র, আওয়ামী লীগ কিংবা নতুন রাজনৈতিক শক্তি—প্রত্যেকেই জুলাইকে নিজেদের মতো করে সংজ্ঞায়িত করতে চাইবে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এসব বয়ানের ভিড়ে সেই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা হারিয়ে যেতে পারে, যারা সাহস আর আশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। জুলাইকে ঘিরে লড়াইটি এখন কেবল ক্ষমতার নয়, বরং স্মৃতি ধরে রাখার লড়াই। তবে এই সময়ের একটি বড় প্রাপ্তি হলো এই বিশ্বাস যে, পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ এবং ১৯৯০ সালের ঘটনার সঙ্গে ২০২৪-এর একটি মিল আছে। মানুষ বারবার এমন মুহূর্ত তৈরি করেছে যখন পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর কার্যকর থাকেনি। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার স্বপ্ন কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচার পতনের পর নতুন ব্যবস্থার প্রত্যাশা—সবই ছিল নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়েছে, পোশাকশিল্প বড় হয়েছে, প্রবাসীদের অর্থে জীবন বদলেছে এবং দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু রাজনীতির গল্পটি ভিন্ন। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

আন্দোলনের ফলে মানুষের আচরণ বদলেছে, কিন্তু আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনী বা রাজনৈতিক দলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বদলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। জুলাইয়ে যে সাহস দেখা গিয়েছিল, তা স্মৃতিতে থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনা বা রাজনৈতিক আচরণে সেই পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। নতুন মানুষ ও দল রাজনীতিতে এলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বা নিয়মের প্রয়োগে আগের মতোই বৈষম্য রয়ে গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

"তাহলে জুলাই কি ব্যর্থ? এত দ্রুত সে সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। জুলাই অন্তত একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। মানুষ কী সম্ভব বলে মনে করে, তার সীমাটা বদলে দিয়েছে। রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, অনেক মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ালে তাকে থামানো যায়—বাংলাদেশের একটি প্রজন্ম সেটা নিজের চোখে দেখেছে। এ অভিজ্ঞতা সহজে হারিয়ে যাওয়ার নয়।"

ক্ষমতার হাতবদল মানেই রাজনীতির নিয়ম বদলে যাওয়া নয়। যদি ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নিয়ম ভাঙার অভ্যাস থেকে যায়, তবে কেবল মুখের পরিবর্তন হবে, রাজনীতির পুরোনো ধরনটিই রয়ে যাবে। জুলাই মানুষকে দেখিয়েছিল অসম্ভবও সম্ভব। এখন পরীক্ষা হলো ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের। গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার অধিকার নয়, বরং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার নাম।

জুলাই বাংলাদেশকে কতটা বদলেছে, তার উত্তর বড় কোনো বক্তৃতায় নয়, বরং ছোট ছোট আচরণে পাওয়া যাবে। একজন পুলিশ সদস্যের নাগরিক আচরণ, আমলার রাজনৈতিক চাপের মুখে ‘না’ বলার সাহস, কিংবা রাজনৈতিক দলের নিয়ম মেনে চলার মানসিকতার মধ্যেই প্রকৃত পরিবর্তন ধরা পড়বে। এছাড়া, বিজয়ী পক্ষের সঙ্গে একমত নন এমন একজন তরুণ ভয়হীনভাবে কথা বলতে পারছেন কি না, তা-ই হবে আসল মাপকাঠি।

— লেখক: জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ।