রাতের চেয়ে ভরদুপুরে ডারউইনের মিচেল স্ট্রিট সাধারণত বেশি নীরব। সেই নীরবতা আজ খানিকটা ভাঙল বাংলাদেশিদের আগমনে। টিম হোটেল এবং সিরিজ কাভার করতে আসা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের হোটেল–মোটেল কাছাকাছি হওয়ায় ডারউইন সিটি সেন্টারের এই সড়কে ছোট পরিসরের মিলনমেলা তৈরি হয়।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন তানজিদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বের হন। খাবারের টেবিলে ঢুঁ দিয়ে ‘আহার’–বিশেষ কিছু মেলে না—এখানে ‘আহার’ বলতে আসলে লেখার উপজীব্য কিছুকেই বোঝানো হচ্ছে বলে জানান উপস্থিতরা। গল্প–আড্ডায় আপত্তি নেই, তবে ছুটির দিনে ক্যামেরা–মাইক্রোফোনের সামনে কে-ই বা দাঁড়াতে চাইবে—সেটাই প্রশ্ন। সাংবাদিকদের অনুরোধে দলের ম্যানেজার ও জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার নাফিস ইকবাল জানিয়েছেন, সন্ধ্যায় নিজেই কথা বলবেন।
আজকের দিনটি ছুটির মতোই ছিল। কারণ ডারউইন টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিনে দুপুরের এই সময়টায় খেলোয়াড়দের থাকার কথা ছিল মাঠে আর সাংবাদিকদের প্রেসবক্সে। তবে অস্ট্রেলিয়াকে সহজে হারানোর আনুষ্ঠানিকতা চতুর্থ দিনেই চা–বিরতির মধ্যেই শেষ হওয়ায় পঞ্চম দিনটি হয়ে যায় ছুটির দিন। ডারউইনের আনন্দময় স্মৃতি নিয়ে আগামীকাল সকালে ম্যাকাইয়ের ফ্লাইট ধরবে দল।
তবে দিনের বাকি সময়টা বিশ্রামেই কাটিয়েছে বাংলাদেশ দল। ছুটির দিন হলেও সন্ধ্যায় বাংলাদেশ দলের সম্মানে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন নৈশভোজের আয়োজন করেছে। এটি হওয়ার কথা এসপ্ল্যানেডে দলের হোটেল ডাবল ট্রি বাই হিলটনে। এই একটি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া পঞ্চম দিনটি পুরোটা জুড়েই বিশ্রাম।
খেতে এসে নাজমুল ও তানজিদ আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলেননি। আজকাল বেশির ভাগ সময় এসব আর প্রয়োজন হয় না—রিলস ও ভিডিওর জন্য সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেই হয়। মিচেল স্ট্রিটের হাঁটার রাস্তায় তারা সে সুযোগটাও করে দিলেন—ভিডিও হলো, ছবি উঠল ক্লিক ক্লিক।
অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর গোপন ফর্মুলা বলতে গিয়ে কথার মাঝে আবার রাস্তা পার হয়ে সোনায় সোহাগা হয়ে হাজির হন পেসার তাসকিন আহমেদ। কিছু সময় পর ওই একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান কোচ ফিল সিমন্স, আরেকটু পর পেসার খালেদ আহমেদও। অলস দুপুরে ডারউইনের মিচেল স্ট্রিট যেন মুহূর্তে বাংলাদেশ সরণিতে পরিণত হয়। হাঁটাচলার ফাঁকে কখনো নাজমুল–তানজিদ, কখনো তাসকিনের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় কয়েকজন সাংবাদিকের দলে।
সাংবাদিকদের দিকে এগিয়ে আসেন এক পথচারী। খেলার খোঁজখবর রাখেন বলে মনে হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ানই হবেন হয়তো—এমন ধারণা জাগে। হাসিমুখে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল! খুব ভালো খেলেছ তোমরা। পরের টেস্টেও নিশ্চয়ই ভালো খেলবে’।
অস্ট্রেলিয়া আসার পর থেকে এই একটি জিনিসই পাচ্ছে বাংলাদেশ—সম্মান, ভালোবাসা, অভিনন্দন, শুভকামনা। নিজেদের শোচনীয় হারের জ্বালাটা বুকে লুকিয়েই বিজয়ীদের হাসিমুখে অভিনন্দন জানাতে পারেন তাঁরা। গতকাল ম্যাচ শেষে মেহেদী হাসান মিরাজও জানিয়েছেন, হোটেলে এক বৃদ্ধার কাছ থেকে প্রশংসা পেয়ে তিনি অবাক হয়েছেন। মিরাজের ভাষ্য অনুযায়ী, এত বয়স্ক একজন মানুষও খেলার খোঁজ রাখেন, আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের চেনেন—এটাই ছিল তাঁর অবাক হওয়ার কারণ।
মিচেল স্ট্রিটেই আছে ইস্তাম্বুল রেস্টুরেন্ট। এর মালিক গ্রিসের নিক নামের এক ভদ্রলোক। তিনি ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে ডারউইনবাসী এবং এখন পরিবার নিয়েই থাকেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা ইস্তাম্বুলে খেতে যাচ্ছেন, ক্রিকেটাররাও মাঝেমধ্যে সেখানে আসেন। আর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ভূমিকা রেখেছে—ম্যাচের আবহে, অনুষঙ্গে—নিককেও কিছুটা নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর আগ্রহের পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে। ইস্তাম্বুল রেস্টুরেন্টে দুজন বাংলাদেশিও কাজ করেন।
প্রথম ৩০ টেস্টে শূন্য জয়, সর্বশেষ ১০ টেস্টে চার—বদলে যাওয়ার এই গল্প বাংলাদেশেরই। নিক বাংলাদেশকে হারানোর খবর শুনে খুশি, তবে একটা কারণে মন খারাপও আছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ডারউইনে এত বছর পর হওয়া টেস্ট ম্যাচ দেখতে সারা দেশ থেকে প্রচুর দর্শক আসবে; ডারউইনের ব্যস্ততম এলাকা মিচেল স্ট্রিট জমে উঠবে এবং ব্যবসা ভালো হবে। কিন্তু তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। প্রখর রোদে জ্বলতে থাকা খাঁ খাঁ সড়কের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘ম্যাচটা তো ডারউইন দলের ম্যাচ নয়, অস্ট্রেলিয়া দল খেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার মানুষ অন্য শহর থেকে আসবে না খেলা দেখতে! আজব।’
রাশিয়া–ইউক্রেন আর ইরান–ইসরাইল মিলে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে যে মন্দা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে, তাও নিকের চিন্তার জায়গা। অস্ট্রেলিয়ায় আয়রোজগার কমে যাচ্ছে, তার ওপর জিনিসপত্রের দাম দিন দিন বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন। তেলের দামে এখানেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। এসবের প্রভাবে ট্যুরিস্ট কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, টাকা না থাকলে মানুষ ঘুরবে কী দিয়ে! এই কারণেই নিক ঠিক করেছেন, গ্রিসে গিয়ে নিজে একটি রেস্টুরেন্ট খুলবেন। সেটাও তিনি চালাবেন, ডারউইনেও চলবে ইস্তাম্বুল।
নিকের রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়েই গল্পের ছলে তাসকিনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের পেস বোলিং নিয়ে। নিকের কথার সারমর্ম—ডারউইন টেস্টে পেসাররা ভালো বোলিং করলেও সেটা করতে হয়েছে কষ্ট করে। না হলে ডারউইনের উইকেটে বোলিং করাটা সহজ ছিল না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা এত ভালো হয়েও তারা কি নিজেদের সেরা বোলিংটা করতে পেরেছে!
কথার মাঝেই চোটের কারণে এই সিরিজে না খেলা আরেক পেসার নাহিদ রানার প্রসঙ্গে একটু আফসোস করেন তাসকিন। তিনি হাত দিয়ে বোলিংয়ের ভঙ্গি করে বলেন, ‘এই উইকেট পুরোনো বলে নাহিদ ভালো করত। ওর জন্য ভালো হতো।’
সব অলস দুপুর বুঝি এভাবেই হয়। এলায়িত আড্ডায় ভর করে হাসি–আনন্দ, পাওয়া না–পাওয়ার কথা। মারারা ওভালের ক্রিকেট থেকে মিচেল স্ট্রিটে নেমে আসে মানুষের আনাগোনা—খুলে যায় মনের জানালা।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেকদের কারও কাছে এই হার ‘অত্যন্ত লজ্জার’, কারও কাছে ‘সবচেয়ে বড় অঘটন’।