আবহাওয়া সতর্কতা ও স্পিডবোট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন আট যাত্রী। গুপ্তছড়া ঘাট ছাড়ার পরপরই জ্বালানি ফুরিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। উত্তাল সাগরে প্রায় চার ঘণ্টা ভেসে স্পিডবোটটি সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনে গিয়ে থামে। জ্বালানি ছাড়া যাত্রা এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যের ঘটনায় মালিক-চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
খারাপ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌপথে স্পিডবোট চালানোয় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সমুদ্রবন্দরে আবহাওয়া বিভাগও সতর্কসংকেত জারি করেছিল। এরপরও সতর্কসংকেত অমান্য করে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে রওনা দেন একটি স্পিডবোট। জরুরি কাজ থাকায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে সেই স্পিডবোটে চেপে বসেন আট যাত্রী।
সকালে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাট থেকে স্পিডবোট ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। উত্তাল সাগরে জ্বালানিবিহীন নৌযানটি প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে। বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দেওয়ার পর স্পিডবোটটি ভাসতে ভাসতে সীতাকুণ্ড উপকূলের ম্যানগ্রোভ বনে এসে থামে।
গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় এ ঘটনা ঘটে। সীতাকুণ্ডের কুমিরা ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া স্পিডবোটটি ভাসতে ভাসতে ওই উপজেলার ভাটেরখিলের কাছে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনে থামে—বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষও বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে স্পিডবোট চালানোর বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
স্পিডবোটের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আট যাত্রীর প্রত্যেকেই বিদেশযাত্রা, আদালতে হাজির হওয়া ও চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। সকাল ১০টায় সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে এসে তাঁরা সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাননি। পরে ৩ হাজার ২০০ টাকায় একটি ১০ সিটের স্পিডবোট ভাড়া করে রওনা হন। সমুদ্র ছিল খুবই উত্তাল; তীব্র স্রোত এবং বড় বড় ঢেউকে পাশ কাটিয়ে স্পিডবোট এগোচ্ছিল। কিন্তু কিছু দূর যেতেই হঠাৎ থেমে যায় এবং ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়।
আজ রোববার সকালে স্পিডবোটের যাত্রী নূর হোসেন (২৮) মুক্তকণ্ঠকে জানান, ঘটনার পর কোনো রকমে তাঁরা সীতাকুণ্ড উপজেলার বন পেরিয়ে শহরে পৌঁছান। এ ঘটনার পরও আতঙ্ক কাটেনি তাঁর। নূর হোসেন বলেন, ‘খুব জরুরি প্রয়োজন ছিল বলে চট্টগ্রাম যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। মাঝসাগরে স্পিডবোট থেমে যাওয়ার পর বড় বড় ঢেউয়ের আঘাতে এটি ভীষণভাবে দুলছিল। চোখ বন্ধ করে কেবল আল্লাহকে ডেকেছি। ভেবেছি, এই যাত্রায় আর বেঁচে ফেরা হবে না। কিন্তু কীভাবে যেন স্পিডবোটটি ভাসতে ভাসতে তীরে পৌঁছে যায়।’
‘সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাট থেকে স্পিডবোটটি ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই ফুরিয়ে যায় জ্বালানি। উত্তাল সাগরে জ্বালানিবিহীন নৌযানটি প্রচণ্ডভাবে দুলছিল। বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন যাত্রীরা। সে অবস্থায় ভাসতে ভাসতে স্পিডবোটটি গিয়ে থামে সীতাকুণ্ড উপকূলের ম্যানগ্রোভ বনে।’
নূর হোসেন জানান, স্পিডবোট থেমে যাওয়ার পর প্রথমে চালক ও সহযোগী ইঞ্জিন সারাতে কিছুটা সময় চান। এরপর তাঁরা জানতে পারেন তাঁদের জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি ছাড়াই যাত্রা শুরুর কারণ জানতে চান আট যাত্রী।
নূর হোসেন বলেন, তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছিল বড় বড় ঢেউ—প্রতিটি ঢেউই যেন তাঁদের জীবন কেড়ে নিতে পারে। তবু শত শত ঢেউ পার হয়ে বোটটি উপকূলের ম্যানগ্রোভ বনে গিয়ে থামে। তিনি বলেন, ‘জোয়ারের উজানমুখী স্রোতের কারণে বেঁচে ফিরেছি। ভাটায় হলে সমুদ্রের গভীরে চলে যেতাম আমরা। জীবন শঙ্কার মধ্যে ফোন করি কোস্টগার্ডকে কিন্তু তাঁদের সঠিক লোকেশন দিতে পারছিলাম না।’
স্পিডবোটটি উপকূলের ম্যানগ্রোভ বাগানের কাছে থামার সময়ের অনুভূতি বর্ণনা করে নূর হোসেন বলেন, ‘রাজ্য জয়ের আনন্দের চেয়েও বেশি কিছু। মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার আনন্দের চেয়ে বেশি তো কোনো কিছুই হতে পারে না।’
স্পিডবোটটি তীরে এসে ভেড়ার সময় তখন বেলা ২টা পেরিয়ে গিয়েছিল বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন। তাঁরা স্পিডবোটটি ঠিক কোথায় ভিড়েছে তা জানতেন না। কারও ধারণা ছিল মীরসরাইয়ে, আবার কারও ধারণা ছিল ফেনীর কোথাও। ম্যানগ্রোভ বাগান থেকে হেঁটে বেরিয়ে বেড়িবাঁধের কাছে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা জানান, এলাকাটি সীতাকুণ্ডের ভাটেরখিল। এরপর একটি অটোরিকশায় চেপে তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে ওঠেন।
যাত্রীরা জানান, জ্বালানি ছাড়া উত্তাল সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া স্পিডবোটটি কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটের সাবেক আলোচিত ইজারাদার আবুল কাশেম ওরফে রাজা কাশেমের বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নূর হোসেন চালকের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে রাজা কাশেমের সঙ্গে কয়েকবার কথা বলে উদ্ধারের অনুরোধও করেন। তবে রাজা কাশেম বারবার বলছিলেন, স্পিডবোটটি কুমিরা ঘাটে নিয়ে যেতে হবে। কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটের ইজারা হারানোর পর রাজা কাশেম বাঁশবাড়িয়া ঘাটের ইজারা নেন—ওই ঘাটেই তাঁর স্পিডবোটটি চলাচল করছিল। কিন্তু শনিবার গুপ্তছড়া ঘাট থেকে কুমিরা ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করে সেটি।
জ্বালানি ছাড়া যাত্রার বিষয়ে জানতে রাজা কাশেমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলে তিনি কেটে দেন। জ্বালানি নিশ্চিত না করে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়ে মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার সতর্কতা জারি করলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সব ধরনের নৌযানের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়। শনিবার সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই স্পিডবোটটি যাত্রা করেছে। ওই স্পিডবোটের চালকের লাইসেন্স ও রুট পারমিট ছিল কি না—এ বিষয়ে জানাতে পারেননি বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (পোর্ট অফিসার) নয়ন শীল। তিনি বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানানো হবে।
নয়ন শীল জানান, রুট পারমিট ছাড়া স্পিডবোট চলাচলের সুযোগ নেই। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যাত্রী পারাপার করলে রুট পারমিট বাতিল হবে। জ্বালানি ছাড়া স্পিডবোটের যাত্রা শুরুর বিষয়টি স্বাভাবিক অবস্থায়ও চরম অবহেলার নামান্তর বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পুরো বিষয়টি অনুসন্ধান করে চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান নয়ন শীল।