ডারউইন টেস্ট যদি এই জায়গাতেই থেমে যায়, তবুও নিশ্চয়ই অতৃপ্তি থাকবে না। গত মাসে হারারেতে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস হার, এরপর এখানে এসে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষেও একই লজ্জার ধাক্কা—এই প্রেক্ষাপটে মারারা স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টেই তিন দিনের মধ্যে জয়ের ক্ষণ গুনতে শুরু করবে বাংলাদেশ দল—ভাবনার বাইরে ছিল।
ক্রিকেটের অনিশ্চিত দিকটি মাথায় রেখেও অন্তত তৃতীয় দিন শেষের উপলব্ধি দাঁড়ায়—এই টেস্ট বাংলাদেশ হারতে পারে না। আবার হারলেও সেটি মেনে নেওয়াটাও ক্রিকেটের অংশ। খেলাটি তো আসলে পাঁচ দিনের, এবং সেটা অস্ট্রেলিয়াও খেলছে।
কাল তৃতীয় দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে মেহেদী হাসান মিরাজ আগাম নিশ্চিত সুরে ঘোষণা দিতে যাননি—‘আমরা জিতব’ বা ‘আমরা জেতার মতো অবস্থায় চলে গেছি।’ বরং ৬ উইকেট নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান পেসার জস হ্যাজলউড যা বলে গেছেন, মিরাজের কথাতেও তেমনই বিনয়। ‘দল হিসেবে আমরা খুব ভালো ক্রিকেট খেলছি’ বললেও জয়ের প্রশ্নে তিনি ডাউন দ্য উইকেট না এসে সেটাকে একরকম ‘ব্লক’ই করে দিলেন, ‘আমরা ওইভাবে চিন্তা করছি না, আমরা চেষ্টা করছি ভালো জায়গায় বল করার জন্য। প্রত্যেকটা উইকেট নিতে গেলে কষ্ট করে বল করতে হবে, কারণ উইকেট (বোলারদের জন্য) অত সহজ নয়।’
এরপর তিনি আরও বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার রান আগামীকাল যত কম হবে, তত ভালো। তাদের বাকি ব্যাটসম্যানরাও যেহেতু এমন পরিস্থিতিতে ভালো করার সামর্থ্য রাখেন, তাই চাপ ধরে রাখতে দ্রুত ২–৩টি উইকেট ফেলার চেষ্টা থাকবে। মিরাজের ভাষায়, ‘ওরা সবাই ভালো ব্যাটিং করে। উইকেটও দিন দিন ভালো হচ্ছে। আমরা বড় লক্ষ্য নিয়ে চিন্তা না করে ছোট ছোট পদক্ষেপে এগোনোর চেষ্টা করছি।’
ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে দিয়েই ডারউইন টেস্টে এতদূর এসেছে বাংলাদেশ। ম্যাচ জিতুক বা না–ই জিতুক, ডারউইনবাসীর মন এ মুহূর্তে আগেই জিতে নিয়েছেন অতিথিরা—প্রায় দুই যুগ পর এই শহরে আসা দলের প্রতি প্রশংসা মিলছে হোটেলের লবি, ব্রেকফাস্ট রুম কিংবা ছোটখাটো কাজে বাইরে যাওয়ার মুহূর্তগুলোতে। আগে এক লেখায় বলা হয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার মানুষ প্রশংসায় অকৃপণ। বাংলাদেশ ভালো খেলে অস্ট্রেলিয়াকে কোণঠাসা করে ফেললেও উল্টো এখন অস্ট্রেলিয়ানদেরই শুভকামনা পাচ্ছে। এই ‘শুভকামনা’ মানে ‘তোমরা জিতে যাও’ নয়। এই ‘শুভকামনা’ মানে ‘তোমরা ভালো খেলো, আমরা ভালো ক্রিকেট দেখি।’
টেস্ট ক্রিকেটের স্বভাবটাও বদলেছে। একসময় টেস্ট মানেই ছিল গড়িয়ে গড়িয়ে খেলা আর শুয়ে–বসে সেই খেলা দেখা। এখন টেস্টের মধ্যেই কখনো টি–টুয়েন্টি ভর করে, কখনো শেষ দিনের শেষ ওভার পর্যন্ত টানটান রোমাঞ্চ ছড়িয়ে পড়ে, সেটি হয়ে ওঠে ওয়ানডের মতোই উত্তেজক। ডারউইনে গত ২২ বছর টেস্ট না হলেও টেস্টের আধুনিক মেজাজটা এখানেও একই রকম দেখা গেল। বাংলাদেশ–অস্ট্রেলিয়ার এই ম্যাচের এমন কোনো আনন্দ নেই, যা দর্শকদের দেয়নি। ডাবল সেঞ্চুরি হয়নি, তবে সেঞ্চুরি হয়েছে। উইকেটে রান, বাউন্স, গতি—সবই আছে। আছে পাঁচ উইকেট, সেশনে সেশনে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা, আর আছে অঘটনের সম্ভাবনাও।
তৃতীয় দিন শেষে উত্তেজনার পারদটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সাধারণত কোনো দল সহজ জয়ের দিকে এগোলে শেষ পর্যন্ত রোমাঞ্চটা ম্লান হয়। কিন্তু ডারউইনে পরিস্থিতি ভিন্ন—কারণ এখানে ‘সহজ’ জয়ের দিকেই যাচ্ছে বাংলাদেশ, যারা অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে এসেছে ২৩ বছর পর। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট জয় সব সময়ই অঘটনের ইঙ্গিত বহন করে। আর অঘটন মানেই তো রোমাঞ্চ!
যদি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া জেতে অথবা কোনো জাদুবলে ম্যাচটা ড্র–ই হয়—তখন বাংলাদেশের মানুষ–দর্শক–সমর্থকদের মন খারাপ হবে। তবে নিরপেক্ষ ক্রিকেটপিয়াসী বলবেন—আহা, কী দারুণ একটা খেলা! এমন টেস্ট ক্রিকেটই তো চাওয়া।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সমঝদারদের বড় একটি অংশ নিজেদের দলের পক্ষেই হিসাব মিলিয়ে নিতে পারছে। তাই তাদের ভাবভঙ্গি বদলায় না, তবু তারা বাংলাদেশের প্রচেষ্টার মানটাও স্বীকার করে বলতে পারে ‘ওয়েল ডান’। বাংলাদেশের জন্য সেটাও একটি বড় অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশ হয়তো হারবে না—এটাই আশা। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে যদি সে রকম কিছু ঘটে, ম্যাচের উত্তেজনার পারদ কোথায় গিয়ে থামবে, সেটাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
টেস্ট ক্রিকেট এমন ‘উপহার’ই বা কয়টা ম্যাচে পায়! আর একটু উল্টোভাবে ভাবলে আশাবাদী হওয়ার কারণও আছে। খেলাটাকে এত ঐশ্বর্য এনে দেওয়ার আনন্দ যারা দেয়, তারা কি কখনো খালি হাতে ফেরে!
আগামীকাল সারাদিন ব্যাটিং করতে চায় অস্ট্রেলিয়া