আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সামনে রেখে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ততা সাধারণত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ে—খেলোয়াড়দের অনুশীলন, কোচের পরিকল্পনা, প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ, সরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনার দৌড়ঝাঁপও চলে সমান তালে। তবে বাংলাদেশে সেই দৌড়ঝাঁপের বড় একটি অংশ যেন প্রতিনিধিদল গঠনের তালিকা ঘিরেই বেশি দৃশ্যমান—কে যাবেন, কার নাম উঠছে প্রতিনিধি তালিকায়, আর কার আগে টিকিট কাটার পালা। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত চারটি বড় আন্তর্জাতিক গেমসের প্রতিনিধি তালিকা অন্তত এমনই কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান বিচ গেমস, এশিয়ান ইয়ুথ গেমস ও ইসলামিক সলিডারিটি গেমস—এই চার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মোট প্রতিনিধি ছিলেন ২৪৮ জন। বাজেট প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি। এর মধ্যে খেলোয়াড় ১৪২ জন, কোচ ১৭ জন এবং ফিজিও ও টিম ডাক্তার মিলিয়ে আরও ৫ জন। বিপরীতে কর্মকর্তার সংখ্যা ৮৪।

এদের মধ্যে ৮৪ জনকে একসঙ্গে নিয়ে প্রশ্ন তোলা সবসময় সম্ভব নয়। আলোচনার মূল কেন্দ্র ৬০ জনকে ঘিরে। কমনওয়েলথ ও বিচ গেমসে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) মহাসচিবের সঙ্গে সফর করা দিবা রহমানের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কমনওয়েলথ ও বিচ—এই দুই গেমসের প্রতিনিধি তালিকায় ‘সিজিএ গেস্ট’, ‘এনওসি গেস্ট’, ‘এনওসি ডেলিগেট’ ও ‘এনওসি মেম্বার’ পরিচয়ে সফর করেছেন ১৯ কর্মকর্তা। একইভাবে বিওএ প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিলেন না—চার প্রতিযোগিতায় মোট ১২ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সফর করেছেন। বাকি ২৯ জন ছিলেন বিভিন্ন ফেডারেশনের সদস্য, সাধারণ সম্পাদক কিংবা সভাপতি—যাঁরা নিজ নিজ দলের সঙ্গে টিম অফিশিয়াল হিসেবে গেছেন। তবে এই ৬০ জনের কাজ ঠিক কী ছিল, তা স্পষ্ট নয়।

এ প্রশ্নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ওঠে টিম অফিশিয়াল নির্বাচনের ধরন নিয়ে। দেখা গেছে, কোনো একটি দলের সঙ্গে যাওয়া দুজন অফিশিয়ালের দুজনই সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের সদস্য। অথচ নিয়ম অনুযায়ী সেখানে একজন কোচ ও একজন টেকনিক্যাল অফিশিয়ালের উপস্থিতি থাকার কথা।

সর্বশেষ ২ আগস্ট গ্লাসগোতে শেষ হওয়া কমনওয়েলথ গেমসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র ধরা পড়ে। জিমন্যাস্টিকস দলের সঙ্গে ছিলেন না কোনো কোচ বা টেকনিক্যাল অফিশিয়াল। দলের একমাত্র অফিশিয়াল হিসেবে সফর করেছেন জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান।

এর আগে গত বছরের নভেম্বরে সৌদিতে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সলিডারিটি গেমসেও একই ধরনের উদাহরণ দেখা যায়। ফেন্সিং, জুডো, কারাতে, সাঁতার, কুস্তি ও উশু—এই ছয়টি দলের কোনো একটির সঙ্গেই ছিলেন না কোচ বা টেকনিক্যাল অফিশিয়াল। প্রতিটি দলের সফরসঙ্গী হয়েছেন সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের সদস্যরা। তারও আগে অক্টোবরে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ গেমসেও একাধিক দলের সঙ্গে ফেডারেশন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। সাইক্লিংয়ে দুই খেলোয়াড়ের সঙ্গে যাওয়া দুজনই ছিলেন কর্মকর্তা—আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও জাহাঙ্গীর আলম।

গত মে মাসে চীনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান বিচ গেমসে অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও ছেলেদের ভলিবল দলে কোচ কিংবা টেকনিক্যাল অফিশিয়াল না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের সদস্যরা ঠিকই সফরসঙ্গী হয়েছেন।

এই সংখ্যাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন না বিওএ মহাসচিব জোবায়দুর রহমান। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক গেমসে কর্মকর্তাদের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়, ‘লোক আমাদের কমই যায়। যে কারণে দেখা যায় আমরা প্রায়ই মিটিং মিস করি। কারও একার পক্ষে একই সঙ্গে খেলার মাঠে থাকা আবার ম্যানেজার্স মিটিংয়ে থাকা সম্ভব নয়। গেমসে কিছু বিশেষ মিটিং থাকে আর সেসব মিটিংয়ে কাউকে না কাউকে উপস্থিত থাকতেই হয়।’

কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কতটা যৌক্তিক—প্রশ্নটি কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; দায়িত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও নির্বাচনপ্রক্রিয়াটিও সামনে চলে আসে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, কোচিং এবং কারিগরি সহায়তাকে কেন্দ্র করে যেখানে পরিকল্পনা দাঁড়ায়, সেখানে কোচ-টেকনিক্যাল অফিশিয়ালের বদলে ফেডারেশন কর্মকর্তারা কতটা যুক্তিসংগত—এ নিয়েই মতভেদ তৈরি হয়েছে।

মহাসচিবের বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়তো প্রস্তুতির ঘাটতি নয়; বরং মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার মতো মানুষের ঘাটতি। তবে মাঠের অভিজ্ঞতা ভিন্ন আঙ্গিকে ইঙ্গিত দেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমনওয়েলথ গেমস ফেরত এক কোচ বলেন, ‘গ্লাসগোতে খেলোয়াড় গিয়েছিলেন ১৫ জন; কিন্তু কর্মকর্তা গিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি (১৭)। আসলে এত কর্মকর্তার প্রয়োজন ছিল না। আমি নিজ চোখে দেখেছি অনেকেই বেড়ানো আর ব্যক্তিগত কাজে বেশি ব্যস্ত ছিলেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসে বিভিন্ন খেলার দলীয় ম্যানেজার বা কোচের ভূমিকায় থাকা একাধিক ফেডারেশন কর্মকর্তা দল দেশে ফেরার পাঁচ থেকে সাত দিন পরও দেশে ফেরেননি।

এই অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে ঘিরে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন নয়। ক্রীড়াঙ্গনে বহুদিন ধরেই ‘স্পোর্টস ট্যুরিজম’-এর অভিযোগ শোনা যায়। খোঁজ নিয়ে আবারও একই তথ্য পাওয়া যায়—স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসে বিভিন্ন খেলার দলীয় ম্যানেজার বা কোচের ভূমিকায় থাকা একাধিক ফেডারেশন কর্মকর্তা দল দেশে ফেরার পাঁচ থেকে সাত দিন পরও দেশে ফেরেননি।

দলের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা কী—আর সেই অতিরিক্ত থাকার ব্যয়ের হিসাবই বা কী—এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন জানা যায়, গেমসের বাজেট থেকেই কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের খরচ বহন করা হয়। যদিও বিওএ মহাসচিব বলেছেন, বিওএ থেকে যাঁরা যান, তাঁরা মূলত আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) আমন্ত্রণেই যান। খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খরচ হয় গেমসের বাজেট থেকেই, আইওসি শুধু কোটা নির্ধারণ করে দেয়।’

কিন্তু সেই সুযোগের আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রীড়াব্যবস্থার ওপরই পড়ে। ফলে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য হয়তো সেই খেলোয়াড়কেই দিতে হয়, যাঁর পারফরম্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয় পুরো প্রতিনিধিদল। জাতীয় দলের এক সাঁতারুর আক্ষেপে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—‘নিয়মিত যাঁর কাছে অনুশীলন করি, বিদেশের মাটিতে প্রতিযোগিতার মুহূর্তে সেই কোচকেই পাশে পাই না। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যই
বলতে পারেন।’

কোচ, নাকি একজন অতিরিক্ত কর্মকর্তা—এটিই এখন বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কর্তৃপক্ষও বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করছে না বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বিওএ মহাসচিবের নতুন নিয়মের ঘোষণায়, ‘আমরা সব ফেডারেশনকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছি। এখন থেকে কোচ হিসেবে যিনি যাবেন, তাঁকে অবশ্যই সার্টিফায়েড হতে হবে। ম্যানেজারকেও হতে হবে টেকনিক্যাল ব্যক্তি। আগের মতো ফেডারেশনের কেউ কোচ বা ম্যানেজার হিসেবে যেতে পারবেন না।’

নিয়মটি কার্যকর হলে অন্তত একটি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে—‘টিম অফিশিয়াল’ পরিচয়ের আড়ালে যে কেউ বিদেশ সফরের সুযোগ পাবেন না।