শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি পঞ্চম দিনের দিকে এগিয়েছে ঠিকই, তবে পঞ্চম দিনে যাওয়ার সম্ভাবনা যে খুবই কম—এই বিশ্বাস নিয়েই ডারউইনের দর্শকেরা আজ ঘরে ফিরেছেন। আগের দিন স্কোরলাইন যা বলেছিল, তৃতীয় দিন শেষে সেটাই আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে।

তবে ‘বিশ্বাস’ বলার জায়গায় আসলে একধরনের বাস্তবতা আছে। অস্ট্রেলিয়ার দিকেও স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য থাকবে—টেস্ট যেন দ্রুত শেষ না হয়। কারণ টেস্ট শেষ হয়ে গেলে ম্যাচের ফলের ভার তাদের পক্ষেই পড়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। যে আলোচনা চতুর্থ দিনের মধ্যেই টেস্ট শেষ হওয়ার আশঙ্কা ঘিরে, তা প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের পক্ষেই বেশি সুবিধাজনক।

টেস্টের আয়ু নিয়ে এই কথাবার্তার সূত্র স্পষ্ট ডারউইন টেস্টের স্কোরকার্ডে। আজ তৃতীয় দিনের খেলা শেষে অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করে পিছিয়ে আছে ৬৭ রানে। এর আগে টেলএন্ডারদের দৃঢ়তার সুবাদে ২২৮ রানের লিড নিয়ে লাঞ্চের পরপর বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৪২৬ রানে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই অঙ্কটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান; ২০০৬ সালে ফতুল্লায় করা ৪২৭-ই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশের লিড ২০৬ অতিক্রম করার পর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের পাতায় চাপ বাড়তে থাকে। কারণ নিজেদের টেস্ট ইতিহাসেই এমন নজির নেই—ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ২০৬ রানের বেশি পিছিয়ে থেকেও তারা ম্যাচ জিতেছে। অর্থাৎ ডারউইনে জিততে হলে ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রানে পিছিয়ে থাকার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার মতো এক রেকর্ড নতুন করে লিখতে হবে তাদের।

তৃতীয় দিনে শেষ সেশনে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া যেভাবে উইকেট হারাতে শুরু করে, তাতে রেকর্ডটা গড়ার পথটা আরও কঠিনই হয়ে যায়। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসেও শুরুটা কাঁপিয়ে দেন। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে তিনি বোল্ড করেন ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ডকে। ১১তম ওভারে ট্রাভিস হেডও হাসানের শিকার হন। হেড কাট করতে গিয়ে শরীরের কাছাকাছি থাকা বলে ব্যাটে লাগিয়ে দেন, কিন্তু বলটি স্টাম্প ভেঙে দেয়।

৩৭ রানে ২ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ভরসা ছিল মারনাস লাবুশেন ও স্টিভেন স্মিথের তৃতীয় উইকেট জুটি। ৩৬ রানের জুটিতে দুজনেই কিছুটা থিতু হন। কিন্তু ২০তম ওভারের শেষ বলে তাইজুল ইসলাম ৫৯ বলে ৩১ রান করা লাবুশেনেকে বোল্ড করে দিলে আবারও চাপে পড়ে স্বাগতিকেরা। স্মিথ আরও একটু এগিয়ে ৪৪ রান করে ফেরেন মেহেদী হাসান মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ১২২ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর ডারউইনের প্রেসবক্সে প্রশ্ন ওঠে—টেস্টটা তাহলে কি চতুর্থ দিনেই যাচ্ছে!

ক্যামেরন গ্রিন তো বটেই, অস্ট্রেলিয়ার আরও একটি বড় সৌভাগ্য ছিল—তাসকিন আহমেদের একটি বলে গ্রিনের স্টাম্পে বল লাগলেও বেলস পড়েনি। অবিশ্বাস্যভাবে স্টাম্পে আঘাত করেও বলটা ছাড়িয়ে যায় বাউন্ডারির বাইরে। সেই সৌভাগ্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়া দিন শেষ করেছে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে।

এর মধ্যে হেডকে দুঃখের পঞ্চম স্তরে নামালেন হাসান মাহমুদ।

ডারউইন টেস্টটা তৃতীয় দিন শেষে এই অবস্থানে পৌঁছেছে—তার বড় কৃতিত্ব প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের টেলএন্ডের ব্যাটিং। এখানে বিশেষত্বটা আসলে কী—নাথান লায়নকে স্লগ সুইপে ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে ইবাদত হোসেনের বিশাল ছক্কা, নাকি হাসান মাহমুদের ১৪ রান করার ছলে ৯২টি বল খেলা—দুই ক্ষেত্রেই ভূমিকা রেখেছে চাপ সামলানোর মানসিকতা।

অস্ট্রেলিয়ানরা বলবে, ‘এর কিছুই নয়। ঝামেলা তো পাকিয়েছে আমাদের ফিল্ডাররা। এক সেশনে তিনটা ক্যাচ ফেলে কেউ? তা–ও আবার এক ওভারে দুইটা। ক্যাচ ফেললে টেলএন্ডার ব্যাটসম্যান কেন, শিশুরাও রান করত পারবে।’

যে যেভাবেই দেখুক, আজ ডারউইন টেস্টের আরও একটি দিনকে শুরু থেকেই বাংলাদেশ করে নিয়েছিল নিজেদের এবং সে কৃতিত্বের প্রায় পুরোটাই টেলএন্ডারদের দারুণ ব্যাটিংয়ের। ১৫৪ বলে মিরাজের ৬৫-কে খুঁটি বানিয়ে সেটাকে ঘিরেই এগোতে থাকেন আগের দিনের অপরাজিত হাসান, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ আর ইবাদত।

কাল দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের লেজের দিকের ব্যাটিং শুরু হয়েছিল ৮৩.৩ ওভারে; মুশফিকুর রহিমের আউটের পর রান তখন ৬ উইকেটে ৩০৮। মিরাজের সঙ্গে এরপর কালকের শেষ সেশন আর আজকের প্রথম সেশন মিলিয়ে টেলএন্ডাররাই অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের দিয়ে বল করিয়েছেন ৫২.৩ ওভার। এই সময়ে রান যোগ হয়েছে আরও ১১৮, যার ৭৫-ই এসেছে আজ। ফলে হ্যাজলউড ৬ উইকেট নিয়ে টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলকের দেখা পেলেও অর্জনটি অস্ট্রেলিয়ানরা ঠিক উদ্‌যাপন করতে পারেনি।

জুটির চিত্রও কিছু ইঙ্গিত দেয়। মিরাজ–হাসানের সপ্তম উইকেটে ৪৬, মিরাজ–তাইজুলের অষ্টম উইকেটে ১৮, মিরাজ–তাসকিনের নবম উইকেটে ৪, এমনকি তাসকিন–ইবাদতের শেষ উইকেটে ৮ রান—যার মধ্যে ইবাদতের ওই ছক্কাটাও আছে।

টুপিখোলা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য টেলএন্ডারদের এই কীর্তিতে তৃতীয় দিনের প্রথম সেশন পার করে লাঞ্চের পরও বাংলাদেশ ৫ ওভার ব্যাটিং করেছে। হাসান, ইবাদতের কথা তো বলাই হলো; মাঝে এক ছক্কা এক চারে তাইজুলের ২৩ বলে ১৭ এবং তাসকিনের দুই বাউন্ডারি মেশানো ৩২ বলে অপরাজিত ১৪ রানের ইনিংস দুটির সময়ও মনে হয়নি অস্ট্রেলিয়ার পেস-বাউন্স খুব একটা ভোগাচ্ছে তাঁদের। তবে প্রথম সেশনে তিনটা ক্যাচ পড়েছে—এর দুটি আবার এক ওভারে।

কিন্তু তাতে কী! তানজিম হাসান তো আগের দিনই বলে দিয়েছেন, ক্যাচ ধরবে–ক্যাচ পড়বে এসব খেলারই অংশ।

অস্ট্রেলিয়া : ১৯৮ ও ৫৩ ওভারে ১৬১/৪ (স্মিথ ৪৪, গ্রিন ৪৩*, লাবুশেন ৩১, হেড ১৭, ক্যারি ৭*; হাসান ২/৩৩, তাসকিন ০/৩৮, ইবাদত ০/৩৮, তাইজুল ১/২৮, মিরাজ ১/২০)। বাংলাদেশ: ৪২৬