নিজামউদ্দিন আউলিয়া ডাকাত ছিলেন এবং তিনি ১০০টি খুন করেছেন—এমন একটি গল্প আমাদের লোকসমাজে প্রচলিত আছে। তবে সুলতানুল মাশায়েখ হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (১২৩৮ খ্রিষ্টাব্দ/৬৩৫ হিজরি—১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ/১৮ রবিউস সানি ৭২৫ হিজরি), বাদাউনে যাঁর জন্ম এবং দিল্লিতে যাঁর মাজার, তিনি কোনোভাবেই ডাকাত ছিলেন না—এমন দাবিই এসব ইতিহাসভিত্তিক আদি গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। একইভাবে, তাঁর বিষয়ে কোনো খুন করার তথ্যও পাওয়া যায় না।

ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে লিখিত ফারসি কিতাব ‘ফাওয়ায়েদ আল ফাওয়াদ’, ‘আফজাল আল ফাওয়ায়েদ’, ‘সিয়ার আল আউলিয়া’—নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে কেন্দ্র করে রচিত এসব নির্ভরযোগ্য আদি গ্রন্থ থেকে জানা যায়, খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার পূর্বপুরুষ খাজা আলী (দাদা) এবং খাজা আরব (নানা) মোঙ্গল প্রাদুর্ভাবের কালে বোখারা থেকে হিজরত করে লাহোর হয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদাউন শহরে এসে বসতি গড়েন। পিতা ও মাতা উভয়ের দিক থেকে তিনি নবী করিম (সা.)–এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)–এর বংশধর ছিলেন।

গ্রন্থগুলোতে আরও বলা হয়, তাঁর ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ খাজা সৈয়দ মীর আলীতে গিয়ে তাঁর পিতা ও মাতার বংশ একীভূত হয়েছে। শৈশবে তাঁর পিতা খাজা সৈয়দ আহমদ (যিনি একজন মহান বুজুর্গ ছিলেন এবং বাদাউনের জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন) ইন্তেকাল করলে তাঁর মহীয়সী মাতা হজরত সৈয়দা বিবি জুলাইখা সংসারের হাল ধরেন। তাঁকে চরকায় সুতা তৈরি করতে দেখা যেত; গৃহপরিচারিকা সেই সুতা বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন এবং সেই সুতা বিক্রির টাকায় সংসারের ব্যয় নির্বাহ হতো—এভাবে পরিবারের ব্যয়ের সংস্থান হতো। একই সময় তাঁর সুশিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়।

১৬ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বাদাউনে পড়াশোনা করেন এবং সেই সময়ের সিলেবাস অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার স্তর কৃতিত্বের সঙ্গে সমাপ্ত করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর তাঁকে ‘দানেশমান্দ’ বলা হতো। ফারসি দানেশমান্দ শব্দের অর্থ জ্ঞানী। দানেশমান্দ হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ পাগড়ি পরানোর রেওয়াজ ছিল, আর পাগড়ি পরানোকে বলা হয় ‘দস্তারবন্দী’। খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে দস্তারবন্দী করিয়েছিলেন বাদাউনের বিখ্যাত বুজুর্গ শায়খ খাজা আলী। (বাংলা মুলুকে আগমনের আগে খাজা জালালউদ্দিন উত্তর প্রদেশের বাদাউনে ছিলেন এবং বাংলার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কালে তিনি বাদাউনের আধ্যাত্মিক দায়িত্ব খাজা আলীকে দান করেন।) তাঁর পাগড়িটি তাঁর মা, যাঁকে সেই যুগের রাবেয়া বসরি বলা হতো, তিনি নিজ হাতে চরকায় সুতা কেটে সেলাই করেছিলেন।

বাদাউনে তাঁর শিক্ষক হিসেবে মাওলানা আলাউদ্দিন উসুলি নামে একজন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন বাদাউনের বিখ্যাত পণ্ডিত। তাঁর কাছেই খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া ‘লুগাত’ তথা অভিধানশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি দিল্লি শহরে যান। তাঁর সঙ্গে যান তাঁর মা, একমাত্র বোন এবং একজন গৃহপরিচারিকা।

দিল্লির মসনদে তখন সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুতমিশের পুত্র সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ। দিল্লিতে তিনি হজরত মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদের কাছে হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং হাদিসের পাঠদানের অনুমতিপত্রও লাভ করেন। (মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদ ছিলেন দুনিয়াত্যাগী একজন বুজুর্গ। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন একদা তাঁকে শাহি ইমামের দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি তা সবিনয় ফিরিয়ে দেন। সেই যুগের হাদিসশাস্ত্রের পাঠ্যগ্রন্থ ‘মাশারেক্ব আল আনওয়ার’–এর রচয়িতা হজরত মাওলানা রজিউদ্দিন সাগানি ছিলেন তাঁর শিক্ষক)।

হাদিসশাস্ত্রের কিতাব ‘মাশারেক্ব আল আনওয়ার’ সম্পূর্ণ মুখস্থ করার পর তিনি সাহিত্যের পাঠ নেন হজরত মাওলানা শামসউদ্দিনের কাছে—যাঁকে ‘শামসুল ওলামা’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ছাত্র হিসেবে তাঁকে তিনি এতটাই স্নেহ করতেন যে নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে নিজের আসনে বসাতেন। পরে খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া আরবি সাহিত্যের বিখ্যাত কিতাব ‘মাক্বামাতে হারিরি’ মুখস্থ করেন। এই সময় জ্ঞানী মহলে তিনি তাঁর অগাধ জ্ঞান, অতুলনীয় স্মৃতিশক্তি এবং অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য ‘নিজামউদ্দিন বাহহাস’ (বিতার্কিক নিজামউদ্দিন) ও ‘মাহফিল শিকন’ (সভা ভঙ্গকারী, তথা যাঁর বক্তৃতা দেওয়ার পর সভায় আর কারও কোনো কিছু বলার থাকে না) উপাধিতে পরিচিত হন।

শিক্ষার্জন শেষ করে তিনি ‘কাজি’ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দিল্লিতে খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া ও তাঁর পরিবার যেখানে থাকতেন, তার অদূরে দিল্লির জামে মসজিদে অবস্থান করছিলেন চিশতিয়া তরিকার মহান সুফি হজরত খাজা নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেলের। তিনি ছিলেন চিশতিয়া তরিকার অন্যতম স্তম্ভ হজরত বাবা ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকরের সহোদর এবং আধ্যাত্মিক প্রতিনিধি। খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া কাজি হওয়ার জন্য তাঁর কাছে দোয়া কামনা করেন। তখন খাজা নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেল তাঁকে বলেন, ‘তুমি কাজি হয়ো না। অন্য কিছু হও।’ তিনি তাঁকে আজোধানে (বর্তমান পাকপাত্তান, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি জেলা) বাবা ফরিদের কাছে যেতে বলেন। বাবা ফরিদ গঞ্জে শকরের নাম খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বাদাউনে থাকতেই শুনেছিলেন। একবার তিনি তাঁর শিক্ষক মাওলানা আলাউদ্দিন উসুলির কাছে পাঠ গ্রহণ করছিলেন। এমন সময় সেখানে আবু বকর নামে একজন কাওয়াল আসেন, যাঁর মুখ থেকে তিনি প্রথম বাবা ফরিদের নাম এবং তাঁর বুজুর্গির কথা শোনেন। বাবা ফরিদ—নামটি হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে এবং বাবা ফরিদকে না দেখেই তিনি তাঁর প্রতি দিওয়ানা হন।

খাজা নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেলের উপদেশ এবং মায়ের অনুমতিক্রমে খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া যখন বাবা ফরিদের দরবারে গমন করেন, তখন তাঁর বয়স ২০ বছর। বাবা ফরিদ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। বাবা ফরিদের হাতে বায়াত হওয়ার পর তাঁর সান্নিধ্যে নিজামউদ্দিন আউলিয়া দ্রুত কামালিয়াত অর্জন করেন এবং বাবা ফরিদ তাঁকে খেলাফত (আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্ব) দান করেন। চিশতিয়া তরিকায় বাবা ফরিদের প্রধান খলিফা তিনি। বাবা ফরিদের পর তিনিই এ তরিকার প্রধান বুজুর্গ। খেলাফত লাভের পর খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া দিল্লি ফিরে আসেন।

কিছুদিন শহরে অবস্থান করার পর তিনি গিয়াসপুর নামক দিল্লির এক শহরতলিতে নিজের খানকা স্থাপন করেন। খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া চিশতিয়া তরিকার পীর হিসেবে যখন তাঁর এ যাত্রা শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স কমবেশি ২৩ বছর। এরপর তাঁর প্রায় ৯০ বছরের ইহকালীন জীবনে তিনি চিশতিয়া তরিকার সবক প্রদান, প্রচার ও প্রসারে নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।