বাসের ভেতরে ওঠার আগেই যাত্রীদের পক্ষে সাধারণত জানা সম্ভব হয় না—চালকের লাইসেন্স ঠিক আছে কি না, তিনি আগে কোনো দুর্ঘটনায় জড়িয়েছেন কি না। তবে ‘অনলাইন বাস টার্মিনাল’ (ওবিটি) নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাসের ভেতর থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলেই যাত্রীরা চালক ও বাস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেখতে পারবেন। পাশাপাশি চালকের সেবা এবং গাড়ি চালানোর ধরন নিয়ে রেটিং, রিভিউ ও মন্তব্য করার সুযোগও থাকছে।
একই কিউআর কোড স্ক্যান করে পুলিশ সদস্যরাও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাস ও চালকের তথ্য দেখতে পারবেন। ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তা জোরদার করতে এমন উদ্যোগ নিয়েছে ওবিটি।
কক্সবাজার থেকে দেশের অন্তত ৪০টি রুটে চলাচলকারী বাস এই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের উদ্যোগে তৈরি এই ব্যবস্থা এখন জাতীয় পর্যায়ে চালুর জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। পুরো উদ্যোগটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাঙামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জসিম উদ্দিন।
ঢাকার পর কক্সবাজার দেশে বাসের অন্যতম বড় গন্তব্য। সেখানে ১০০টির বেশি পরিবহন কোম্পানি সক্রিয় থাকায় কক্সবাজার থেকেই ওবিটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যটন দিবসে ওবিটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
বর্তমানে ১০২টি পরিবহন কোম্পানি এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই হাজার চালক ও সমানসংখ্যক বাস যুক্ত হয়েছে। শুরুটা কক্সবাজারকেন্দ্রিক হলেও ধীরে ধীরে পরিধি বেড়েছে।
ওবিটির উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং সড়ক নিরাপত্তায় যাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে।
জসিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়ার আগেই ওবিটির সিস্টেমে কাউন্টার থেকে বাস, চালক, সুপারভাইজার, গন্তব্য, ভাড়া, শিডিউলসহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হয়। এরপর ওবিটির ভার্চ্যুয়াল কল সেন্টার থেকে বাস ছাড়ার ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে সুপারভাইজারকে ফোন করে এসব তথ্য যাচাই করা হয়।
একই সময়ে নিরাপদ গতিতে গাড়ি চালানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কল ও নির্দেশনার ফলে চালকদের মধ্যে তাঁরা নজরদারির মধ্যে আছেন—এমন একটি বোধ তৈরি হয় বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। এতে চালকেরা আরও সতর্কভাবে গাড়ি চালান।
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এই নজরদারির ফলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। আমাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওবিটিতে নিয়মিত তথ্য দেওয়া বাসে দুর্ঘটনার হার অনেক কমে আসছে।’
ওবিটির আরেকটি লক্ষ্য হলো—চালকের ওপর নজরদারিতে শুধু পুলিশ নয়, যাত্রীদেরও যুক্ত করা। অর্থাৎ যাত্রী শুধু সেবাগ্রহীতা নন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা থাকবে।
একটি বাসে ৩০–৪০ জন যাত্রী থাকলেও চালক কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, অতিরিক্ত গতি তুলছেন কি না কিংবা যাত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছেন—এ বিষয়ে সাধারণত কোনো নিয়মিত তথ্য তৈরি হয় না। ওবিটির মাধ্যমে যাত্রীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন।
বাসের দৃশ্যমান স্থানে লাগানো ওবিটির স্টিকারে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে কিংবা ওবিটির ওয়েবসাইট www.obtbd.com-এ গিয়ে যাত্রীরা চালকের আচরণ, গাড়ির গতি ও যাত্রীসেবা নিয়ে রেটিং, রিভিউ ও মন্তব্য করতে পারবেন। প্রয়োজনে অভিযোগও (রিপোর্ট) করা যাবে। যাত্রীরা যে মতামত দেন, তার ভিত্তিতে পরিবহনগুলোর রেটিং তৈরি হয় বলে বলা হয়েছে; ফলে অন্য যাত্রীরা বাসে ওঠার আগেই সংশ্লিষ্ট পরিবহন সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন।
অন্যদিকে পুলিশ সদস্যরা ‘রোড মনিটর’ নামের অ্যাপ দিয়ে একই কিউআর কোড স্ক্যান করলে আরও বিস্তারিত তথ্য দেখতে পারবেন। সেখানে চালকের ছবি, লাইসেন্সের তথ্য, মুঠোফোন নম্বর এবং আগের দুর্ঘটনা বা মামলার রেকর্ড দেখা যায়। একই কিউআর কোড থেকে যাত্রী ও পুলিশ তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা তথ্য পেতে পারছেন।
ওবিটি এখনো দেশের কোনো সরকারি জাতীয় ব্যবস্থা নয়। এটি কক্সবাজার জেলা পুলিশের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও এখনো হয়নি। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে এ বিষয়ে উপস্থাপনা হয়েছে।
উদ্যোগটিকে ইতিবাচক দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা। যোগাযোগবিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নিরাপদ সড়কে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ভালো উদ্যোগ। এতে চালক ও যানবাহনের তথ্য এক জায়গায় থাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা সহজ হবে।
তবে অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, শুধু তথ্য ও নজরদারিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সময়ের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটিকে আরও উন্নত করে ‘অ্যাম্বুলেন্স মডেলের’ (জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত ব্যবস্থা) দিকে নিয়ে যেতে হবে।