বয়সের ভারে শরীর এখন ন্যুব্জ, বদলে গেছে প্রযুক্তির ধরন আর সংবাদপত্রের চাহিদা। তবে চার দশক পার হয়ে গেলেও জীবনযাত্রার মান বদলায়নি ৭০ বছর বয়সী মো. গিয়াসউদ্দিনের। এক সময় সাইকেল চালিয়ে শত শত পাঠকের দোরগোড়ায় পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া এই মানুষটি আজ শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে প্রখর রোদে মাথায় খবরের বোঝা নিয়ে হেঁটে চলেন প্রতিদিন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও বিভিন্ন বাড়ি, দোকান ও কার্যালয়ে সংবাদপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন গিয়াসউদ্দিন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর সাইকেল চালাতে না পারলেও, বয়সের ভার উপেক্ষা করে প্রতিদিন হেঁটেই কাজ করছেন তিনি।

গিয়াসউদ্দিন জানান, শৈশবে মাতৃহীন হওয়ার পর চরম অভাবের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় গিয়ে কিছুদিন চকলেট বিক্রি করেন তিনি। পরবর্তীতে মতলবে ফিরে ১৯৭৫ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের একটি উন্মুক্ত এজেন্সির মাধ্যমে মাত্র পাঁচ কপি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এনে পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন। সে সময় ওই এলাকায় সংবাদপত্রের পাঠক ছিল খুবই কম। বর্তমানে তিনি দাউদকান্দির একটি এজেন্সি থেকে পত্রিকা এনে বিক্রি করছেন এবং এর আগে মতলব দক্ষিণ থেকেও পত্রিকা আনতেন।

আশির দশকে সংবাদপত্রের চাহিদা বাড়লে তিনি সাইকেলের পেছনে বিশেষ বাক্স তৈরি করে বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা সরবরাহ করতেন। কিশোর বয়সে শুরু হওয়া এই পেশাই বার্ধক্যে তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মতলব উত্তরে তিনিই একমাত্র নিয়মিত পত্রিকা হকার, অন্য অনেকে অনেক আগেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক গিয়াসউদ্দিন সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। বড় মেয়ে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করে বিয়ে করেছেন এবং অন্য সন্তানরাও পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন। স্ত্রী রাজিয়া খাতুন দীর্ঘদিন ধরে সংসারের সব দায়িত্ব নিয়ে তাকে সহযোগিতা করছেন। তবে বর্তমান আয়ে সংসার চালানো তার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

মো. গিয়াসউদ্দিন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘অনেকে এই পেশায় এসেছে, আবার চলেও গেছে, কিন্তু আমি কখনো ছাড়িনি। গত বছর অসুস্থতা ও করোনার প্রভাবে কিছুদিন পত্রিকা বিক্রি করতে পারিনি। এখন বয়স হয়েছে, সাইকেলও চালাতে পারি না, তারপরও হেঁটেই মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছি। জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এ কাজ করে যেতে চাই।’

তিনি আরও জানান, মতলব উত্তর উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) উদ্যোগে সরকারি সহায়তায় একটি ছোট ঘর পেয়েছেন। বর্তমানে সেই ঘরেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তবে সংসারের ব্যয় মেটাতে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

এই বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওমর ফারুক বলেন, ছোটবেলা থেকেই গিয়াসউদ্দিন ভাইকে প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে রিকশা, সাইকেল ও হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখছি। তিনি অত্যন্ত সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। তবে পত্রিকা বিক্রির সামান্য আয় দিয়ে তার সংসার চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।