জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের পর সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নিজ নিজ ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ পোস্ট দেন। সেখানে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ভূমিকা, স্মৃতিচারণা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে ঘিরে প্রত্যাশার কথা উঠে আসে।

দুই নেতার পোস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শত শত ‘মব’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণ) মোকাবিলার অভিজ্ঞতাও উল্লেখ করা হয়।

রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীন ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদের দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের ১ মার্চ। সেই হিসেবে তাঁদের কমিটি গতকাল রাতে প্রায় আড়াই বছর পূর্ণ করেছে। গতকাল রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাকিবুল, নাছিরসহ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতা (সুপার ফাইভ হিসেবে পরিচিত)।

সাক্ষাতের পর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট লাখো কোটি শোকরিয়া—অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’

রাকিবুল ইসলাম দীর্ঘ সময় ছাত্রদলের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বিএনপির সদ্যবিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিএনপি ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠনের নেতা এবং দায়িত্ব পালনে যাঁদের সহযোগিতা পেয়েছেন, তাঁদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।

পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ, সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, সবগুলো কলেজের নেতাদের নিয়ে আমি আমৃত্যু গর্বিত। কারণ আমার এসব নেতার নামে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত খবরের শিরোনাম হয়নি। প্রচণ্ড আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও তাঁরা অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠা সঙ্গে নিজেদের আওতাধীন ইউনিটকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ থেকে বলছি, সবগুলো ক্যাম্পাসে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি বিকাশে চেষ্টা করেছি। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দ্বারা ক্যাম্পাসগুলোতে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন না হন, সেজন্য বিশেষ মনোযোগী ছিলাম। আমার নিজ দলের বাইরেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেকোনো বিষয়ে আমার শরণাপন্ন হলে আমি আমার জায়গা থেকে সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা করেছি।’

কমিটির অর্জন হিসেবে রাকিবুল ইসলাম জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি প্রণয়ন এবং রাজপথে কার্যকর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী বাস্তবতায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শত শত মবকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক বুলিংকে উপেক্ষা করে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে।’

পোস্টের শেষাংশে ছাত্রদল সভাপতি লিখেছেন, ‘একটা নতুন জীবন শুরু করতে চাই। নিজেকে আরও বেশি পরিশুদ্ধ, মানবিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়তে চাই। ভুল–ত্রুটির ঊর্ধ্বে কেউ নয়। ফলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালে আমারও ভুল–ত্রুটি রয়েছে। কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল। পরিশেষে ছাত্রদলের আসন্ন নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন, সেই প্রত্যাশা রইল।’

সভাপতির পর আজ শুক্রবার সকালে ফেসবুকে একই ধরনের পোস্ট দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন। তিনি লিখেছেন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি— সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে আমার সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।

নাছির উদ্দীন পোস্টে লিখেছেন, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। সেই উত্তাল সময়ে নেতা–কর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাঁদের সাহস জোগানো, সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা—এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতা–কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন।’

আন্দোলনের সময় নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আবদুল কাদেরসহ তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ সমন্বয়কদের সঙ্গে কাজ করার কথা উল্লেখ করে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আন্দোলনের সময়ে তাঁরা ছাত্রদলকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয়তো ছাত্রদলের অবদান তাঁরা সব সময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেননি; কিন্তু আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, সংকটের সময়ে যাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন, ইতিহাসের বিচারে সেই সহযোগিতার মূল্য অপরিসীম।’

দীর্ঘ দায়িত্বকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে উল্লেখ করে নাছির উদ্দীন লিখেছেন, ‘সেটা হলো মব সংস্কৃতি। চারদিকে নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিল না। সব প্রোপাগান্ডা কাটিয়ে সংগঠনের নেতা–কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা ছিল প্রতিনিয়ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি কোনো একজনের কৃতিত্ব নয়; এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতা–কর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।’

পোস্টের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, ‘আজ বিদায় নিচ্ছি একটি দায়িত্ব থেকে। কিন্তু সম্পর্ক থেকে নয়, সংগ্রাম থেকে নয়, আদর্শ থেকে নয়। দেখা হবে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে, অন্য কোনো সময়ে। পরবর্তী নেতৃত্বের হাত ধরে প্রাণের সংগঠন ছাত্রদল আরও শক্তিশালী হোক। ছাত্রদলের প্রতিটি সহযোদ্ধার আগামী সুন্দর হোক।’