জামালপুরে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ–সংকটের প্রভাব বেশি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় দিনে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে জেলার বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে তারা। এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছে সমিতি।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. সাহিদুল ইসলামের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, সমিতির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে এবং গ্রাহকেরা ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছেন।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রচণ্ড গরম ও অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে গ্রাহকেরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও অবনতি হয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে—এ আশঙ্কা করছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ কারণে সমিতির অফিস, উপকেন্দ্র এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তীব্র লোডশেডিং প্রসঙ্গে ইসলামপুর উপজেলার নটাকান্দা এলাকার আটজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং নতুন নয় এবং সারা বছরই কমবেশি লোডশেডিং থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
নটাকান্দা এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। সেটাও টানা নয়। ৩০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকলে কয়েক ঘণ্টার জন্য আবার চলে যায়। এবার লোডশেডিং আগের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।”
একই এলাকার মো. রকি ও কাউসার আহাম্মেদও তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার কথা জানান।
মেলান্দহের শ্যামপুর এলাকার বাসিন্দা রুকন মিয়ার অভিযোগ করেন, দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুৎ না থাকায় মুঠোফোনে চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না এবং ফ্রিজের খাবারও নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ অপরিহার্য একটি সেবা হলেও তা ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) সাহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁরা নিয়মিত প্রশাসনকে পরিস্থিতি জানাচ্ছেন। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও ও ওসিদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রগুলোকে অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কোনো উপকেন্দ্র বা অফিসে হামলা বা ভাঙচুর হলে হাজার হাজার গ্রাহক দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।” লোডশেডিং প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছায় লোডশেডিং হয় না। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ কম পাওয়ার কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছি।’
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সমিতির আওতায় গ্রাহকসংখ্যা প্রায় আট লাখ। জামালপুরের পাশাপাশি কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর এবং সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার কিছু এলাকাতেও এই সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এসব এলাকাসহ জামালপুর জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদার বিপরীতে চলতি মাসের শুরু থেকে জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ঘাটতি সামাল দিতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।