বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় বিশ্বভারতীর ছাত্র ছিলেন, পরে সেখানকার শিক্ষকও হন। কিছু সময় তিনি নেপাল সরকারের জাদুঘরের কিউরেটরের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁকে বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও শান্তিনিকেতনের প্রাকৃতিক দৃশ্য, বিশেষ করে কোপাই নদীকে কেন্দ্র করে তাঁর অসাধারণ কাজের কথাও নানা আলোচনায় এসেছে। বিনোদবিহারীর ছাত্র ছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। শিক্ষক বিনোদবিহারীকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেছিলেন তথ্যচিত্র দ্য ইনার আই

বিনোদবিহারীর বালক বয়সের কিছু দিন কেটেছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে। শতবর্ষ আগের সেই স্মৃতির সূত্র ধরে তিনি লিখেছেন, ভাই বনবিহারী মুখোপাধ্যায় গোদাগাড়ীর রেল কলোনির চিকিৎসক ছিলেন এবং ভাইয়ের সঙ্গে মাকে আসতে হয়েছিল; সেই সুবাদেই বিনোদবিহারীরও আসা। তাঁর শেষজীবনে প্রকাশিত বই চিত্রকর-এ সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা পাওয়া যায়।

বইয়ে থাকা একটি অংশে তিনি লিখেছেন, ‘মস্ত বাগান, একদিকটা কলাগাছের ঝাড়ে প্রায় অন্ধকার হয়ে আছে, আর বাকি অংশ আগাছায় ভরা, মাঝে মাঝে বিলিতি বেগুনের গাছ। আমাদের রাঁধুনি ও তার স্ত্রী বাড়িতেই থাকে। রাঁধুনির নাম মহাদেব। সমস্তিপুর আর গোদাগাড়ি ছাড়া আর কোথাও সে যায়নি। মায়ের সময় কাটে এদের সঙ্গে গল্প করে ও রান্না করে।’

বিনোদবিহারীর জন্ম ১৯০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার বেহালায়। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই গুণী শিল্পীর চোখে একটি ভুল অস্ত্রোপচার হয়, যার ফলে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। মৃত্যুর দুই বছর আগে, ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের চিত্রকর বইটি কলকাতা থেকে প্রকাশ করে অরুণা প্রকাশনী। লেখকের অঙ্কিত স্কেচ অবলম্বনে এর প্রচ্ছদ করেন সত্যজিৎ রায়।

এই বইয়ে তিনি আজ থেকে শত বছর আগের রেল কলোনির একজন চিকিৎসকের বাংলোর চেহারা কেমন ছিল—তা বর্ণনা করেছেন। তাঁর লেখায় আছে, ‘খড়ের ছাউনিওয়ালা বেশ বড় বাংলোতে আমরা এসে উঠলাম। ভেতরে উঁচু পাঁচিল-ঘেরা উঠোন, বাঁদিকে একসারি ঘর, ডানদিকে আরেক সারি খড়ের ঘর। এই ঘরগুলোর মধ্যেই রান্না, ভাঁড়ার, গুদোম এবং চাকর থাকবার ব্যবস্থা ছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায় মানকচুর ঝাড়। ইতিপূর্বে খড়ের ঘরেও কখনো থাকিনি আর মানকচুর গাছও কখনো দেখিনি। মস্ত বাগান, একদিকটা কলাগাছের ঝাড়ে প্রায় অন্ধকার হয়ে আছে, আর বাকি অংশ আগাছায় ভরা, মাঝে মাঝে বিলিতি বেগুনের গাছ। আমাদের রাঁধুনি ও তার স্ত্রী বাড়িতেই থাকে। রাঁধুনির নাম মহাদেব। সমস্তিপুর আর গোদাগাড়ি ছাড়া আর কোথাও সে যায়নি। মায়ের সময় কাটে এদের সঙ্গে গল্প করে ও রান্না করে।’

ঝোপঝাড়ের বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘বাড়ির পেছনে ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে লম্বা হয়ে উঠেছে বড় বড় গাছ, যেন মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সবুজের প্রাচীর।’

একই সূত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বিনোদবিহারীর লেখায় বারবার সমস্তিপুর নামটি এসেছে। গোদাগাড়ীতে এখন ৪১৫টি গ্রাম রয়েছে। তার মধ্যে এ রকম কোনো গ্রামের নাম পাওয়া যায় না, তবে সমাসপুর ও সন্তোষপুর নামে গ্রাম আছে।’

এই পরিবেশে শিশু বিনোদবিহারীর দিন কাটার চিত্রও তিনি এভাবে ধরেছেন—‘সকালে দাদা যান হাসপাতালে, মা যান রান্নাঘরের দিকে, আর আমি একা বাইরে ঘুরে ঘুরে দেখি গাছ। সবই দেখি, কেবল মানুষ দেখতে পাই না। বিকেল হলে কয়েকখানা চেয়ার বাইরে রাখা হয়। লোকজনের আগমন কমই হয়। প্রায় প্রতিদিনই স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আসে। আধা বাংলা, আধা হিন্দিতে তার কাজের কথা বলে যায়। চিকিৎসাসূত্রে একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। বিকেলবেলা পুলিশ অফিসার, দাদা ও আমি, তিনজনে বসি। দুজনের মধ্যে চুরি-ডাকাতির গল্প হয়।’

গোদাগাড়ী রেল কলোনিতে সন্ধ্যা নামার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘একসময় সন্ধে হয়ে আসে। লন্ঠন হাতে একজন লোক আসে। পুলিশ ইন্সপেক্টর বিদায় নেন। দাদা আমাকে তখন পায়চারি করতে করতে তারা দেখান। চশমার ভেতর দিয়ে তারা দেখি—কালপুরুষ, গ্রেট বেয়ার ইত্যাদি। বাইরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে, লন্ঠন জ্বললে আমরা ভেতরে যাই।’

বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় সমস্তিপুরের উল্লেখ বারবার এসেছে। একই প্রাসঙ্গিকতায় তিনি লিখেছেন, ‘কলকাতার গল্প শুনলে প্রায়ই মহাদেব বিশ্বাস করতে চায় না, বলে সমস্তিপুরের চাইতে বড় শহর আর নেই।’

সেখানে পোস্ট অফিস ও হাটবাজারের বর্ণনায় বিনোদবিহারী লিখেছেন, ‘পোস্ট-অফিস থেকে চিঠিপত্র নিয়ে বাজার হয়ে বাড়ি ফিরি। বাজারে বড় বড় চিতল মাছ, রুই, কাতলা—দু টাকা থেকে পাঁচ টাকার মধ্যে যেকোনো একটা মাছ কেনা যেতে পারে। কথায় বলে “বাজারের ভিড়”—কিন্তু গোদাগাড়ীর বাজার সম্বন্ধে এ কথা খাটে না। এত মাছ, এত তরিতরকারি কে যে কেনে। মহাদেবকে জিজ্ঞেস করি। মহাদেব বলে অনেক লোক আছে। বাজারে আমি বেশি ভিড় কোনোদিন দেখিনি। হাসপাতালে যাই বেড়াতে। খড়ের ঘরে ডাক্তার বসেন, পাশে ছেঁচা বেড়া দেওয়া কম্পাউন্ডারের ঘর, টেবিল, শিশি-বোতল। হাসপাতালে রেখে যাদের চিকিৎসা করা হবে, তাদের জন্য আর একখানা লম্বা খড়ের ঘর।’

রাজশাহীর এই অঞ্চলের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও লিখেছেন, ‘গোদাগাড়িতে মানুষ বেশি দেখিনি, কিন্তু সাপ দেখেছিলাম অনেক। থাকতে থাকতে গোদাগাড়ীর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আসছে। বাইরে বেরিয়ে মা আর বলেন না এ কোন জঙ্গলে এলাম। এই অবস্থায় দাদা একদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে বললেন, “আমাদের বনবাস শেষ হয়েছে। বদলির খবর এসেছে।” জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা হলো। ফিরে এলাম কলকাতার শানবাঁধানো শহরে। বাড়িতে জিনিসপত্র নামানো হলো আর সেই সঙ্গে নামানো হলো স্পিরিটভরা বড় একটা কাচের জার, ভেতরে মুঠোপরিমাণ চওড়া দুটো গোখরো সাপের মাথা। জারের ওপর লেবেল দেওয়া, ওপরে লেখা: গোদাগাড়ির স্মৃতি।’

এখনও রেল কলোনির জমির মালিক রেল কর্তৃপক্ষই রয়েছে। তবে এলাকার লোকজন নিজেদের মতো বাড়িঘর ও দোকানপাট গড়ে নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যেই বিনোদবিহারীর জঙ্গলাকীর্ণ কলোনির স্মৃতির ছাপ মিশে গেছে বলে বিবরণে উঠে আসে।