কাল ছিলেন হাসান মাহমুদ, আজ তানজিদ হাসান। পেস বোলিংয়ের পর তানজিদের সৌজন্যে অস্ট্রেলিয়ানদের নজরেই এখন বাংলাদেশের ব্যাটিং। তানজিদের ব্যাটিং এতটাই সাবলীল যে তাকে নিয়ে আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
গত মে মাসে সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেকের পর এবার ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেলেন। এর মধ্যে ৪০টি ওয়ানডে এবং ৫৩টি টি–টুয়েন্টি খেলেছেন তানজিদ—ফলে তার সামর্থ্য পরিচয় করিয়ে দিতে আলাদা করে বেশি বলার দরকার পড়ে না। টি–টুয়েন্টিতে ৫৩ ম্যাচে ১৩টি ফিফটির পাশাপাশি ওয়ানডেতে ৯টি ফিফটি আছে; সেঞ্চুরিও রয়েছে একটি।
টেস্টে ছিল দেখার অপেক্ষা। ডারউইনের সবুজ উইকেটে প্যাট কামিন্স, জস হ্যাজলউড ও ওয়েবস্টারদের সামলে ১৮৮ বলে তিন অঙ্কে পৌঁছে সেটাও জানিয়ে দিলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তিনি যেন প্রথম বাংলাদেশি হিসেবেই সেঞ্চুরি করে থেমে থাকেন—এই বার্তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর সেটি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিংয়ের বিপক্ষে।
ইনিংসের ৬৪তম ওভারের শেষ বলে নাথান লায়নকে লং অফে ঠেলে এক রানের জন্য দৌড়, অন্য প্রান্ত থেকে আসা নাজমুল হোসেনকে মাঝ উইকেটে অতিক্রম করেই তানজিদ লাফিয়ে উঠে শততরানের উদযাপন শুরু করেন। এরপর ড্রেসিংরুমের দিকে ঘুরে ব্যাটও উঁচিয়েছেন তানজিদ।
তানজিদের সেঞ্চুরির সময় বাংলাদেশও তখন সুসংহত। আগের দিন ওপেনার সাদমান ইসলাম ও আজ প্রথম সেশনে মুমিনুলের উইকেট হারিয়ে স্কোর দাঁড়ায় ২৩০/২। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে ৩২ রানে।
তানজিদ একদিক দিয়ে বিশেষ সুবিধাও পেয়েছেন। মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো টেস্ট ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়ার ইতিহাস তানজিদের ক্ষেত্রে তেমন নয়। ডারউইন টেস্টটি তার ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। তবে ড্রাইভ, পেছনের পায়ে ভর করে করা পাঞ্চ কিংবা ওয়েবস্টারকে তেড়ে এসে মারা ছক্কা—এসব ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তার আগে খেলেছেন মাত্র একটি টেস্ট থাকলেও তিনি যেন সেই ব্যবধানটাকে অনুভব করতে দিচ্ছেন না। অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে তাই তার ইনিংসটিই বেশি বিস্ময়ের।
মুমিনুলের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে তানজিদের ১০২ রানের জুটি ভেঙেছে ফিফটির কাছাকাছি থেকে—মুমিনুলের আউটের পরই। আর একটু হলেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটি হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু মুমিনুল আউট হয়ে যাওয়ায় ২০০৩ সালে কেয়ার্নসে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে হাবিবুল বাশার ও হান্নান সরকারের ১০৮ রানের জুটিই এখনো সর্বোচ্চের তালিকায় আছে।
তানজিদের প্রথম ৫০ আসে ১০২ বলে, চার ছিল ৫টি। এরপর দ্বিতীয় ৫০ মাত্র ৮৬ বলে—আরও তিনটি চার ও একটি ছক্কা যোগ করে ফেলেন তিনি। সেঞ্চুরির পর ১০১ রানে অবশ্য আউট হন। খেলেন ১৯৭ বল।
অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ দিনভরেই দাপট দেখিয়েছে। আগের দিনের শেষ সেশনেই তারা ১ উইকেটে ৯৬ করে ফেলেছিল। তবে দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে এসে স্টিভেন স্মিথ ভয় ধরালেন—উইকেট নাকি ‘ট্রিকি’! বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় দিন ব্যাটিং করা সহজ হবে না। কাজটাকে সত্যি সত্যি কঠিন করতে আজ সকাল থেকে মরিয়া চেষ্টা চালালো অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বোলারদের গতি, বাউন্স, সুইংয়ের সঙ্গে ফিল্ডারদের কটু কথা—কিছুই মনসংযোগ ভাঙতে পারেনি তানজিদের।
সেঞ্চুরি করেই ফিরলেন তানজিদ।
তানজিদ সহ প্রথমে মুমিনুল এবং পরে নাজমুল হোসেনের ব্যাটিং দেখেও স্মিথের আগের দিনের বলা কথাটার সঙ্গে উইকেটের তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য বাংলাদেশ শিবিরে কালও কথাটা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। স্মিথ উইকেট নিয়ে কী বলেছেন, সেটি শুনে কাল সন্ধ্যায় হাসতে দেখলাম বাংলাদেশ দলের এক সদস্যকে। তাঁর পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুনলে লজ্জাও পেতে পারেন স্মিথ। অস্ট্রেলিয়ান এই ব্যাটসম্যান নাকি বাংলাদেশকে ভয় দেখাতেই কথাটা বলেছেন। ‘মাইন্ডগেম’ যাকে বল আরকি! উইকেটে আসলে ‘ট্রিকি’ কিছু নেই।
আর থাকলেই কী! সেটা তো বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে বাধা হতে পারছে না। তানজিদের সেঞ্চুরির ঠিক আগে ফিফটি হয়ে গেছে অধিনায়ক নাজমুলেরও। স্মিথের কথাটাকে সত্যি ধরে নিলে বরং টেস্টে তানজিদের প্রথম সেঞ্চুরির মাহাত্মটাই আরও বাড়ে।
মজার ব্যাপার হলো, তানজিদের এই সেঞ্চুরিতে কিছুটা অবদান আছে স্মিথের নিজেরও। ব্যক্তিগত ৬২ রানের সময় স্লিপে ক্যাচ দিয়েও তানজিদ বেঁচে যান স্মিথ সেটা নিতে পারেননি বলেই। আসলে ডারউইনের উইকেট ‘ট্রিকি’ নয়, ‘ট্রিকি’ বোধহয় এই উইকেটের স্লিপে দাঁড়িয়ে তানজিদের ক্যাচ নেওয়াটাই।
বাংলাদেশ এখানে লড়াই করতে এসেছে—দুর্দান্ত দিনে অস্ট্রেলিয়ানদের প্রশংসা