নিজের সময়ের কণ্ঠস্বর হয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। মার্ক্সবাদী চেতনা, মানবিক সংবেদনা এবং নিজের কাব্যভাষায় তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক ধরনের নিজস্ব নন্দন। জন্মশতবর্ষ ঘিরে ফিরে দেখা হচ্ছে—তাঁর সময়ের কবিতা কীভাবে কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠল।

সুকান্ত ভট্টাচার্য হঠাৎ আবির্ভূত কোনো কবি নন। বাংলা কবিতার স্বাভাবিক বিকাশের ধারাতেই তাঁর আগমন—যদিও তিনি অভিনবও নন, আবার সাধারণও নন। তাঁকে অসাধারণ বলা যায় এই কারণে যে তিনি নিজের কালের কণ্ঠস্বরকে অভিনব ভাষায় ধরতে পেরেছিলেন। জনগোষ্ঠীর ভেতরে গুমরে ওঠা বাণী এবং নন্দনকে কবিতায় অব্যর্থভাবে ধারণ করেই তিনি স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছিলেন। বড় কবির কাজও অনেকটা এমনই—কালের ভেতরের সুরকে এমনভাবে ভাষা দেওয়া, যা পরেও টিকে থাকে। এই লেখায় উদ্দেশ্য, সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতায় কোন প্রেক্ষাপটে এবং কী ধরনের অবদান রেখে বড় কবির তকমা অর্জন করলেন, তা বোঝার চেষ্টা করা।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলা কবিতার মেজাজ দ্রুত বদলাতে থাকে। বদলে যেতে থাকে জীবনকে দেখার ভঙ্গি, উচ্চারণ ও ভাষা—সব মিলিয়ে। গত শতাব্দীর সঙ্গে নতুন কবিতার সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। নতুন শতাব্দীর নতুন যুগের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নন্দনতাত্ত্বিক বাহাসের দিকে চোখ রাখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথ তিরিশের দশকের কবিদের নন্দনকে খুব ভালোভাবে নিতে পারেননি; কারণ, বাংলা কবিতার নন্দন ইতিমধ্যে রবীন্দ্রযুগ পার হয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তিত হয়েছে জীবনকে দেখার চোখ ও মনোভাব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের ওই সময়ের কাব্য-কবিতাকে পাশাপাশি রাখলে সেটাই বোঝা যায়। যুগান্তরের ভিন্নতা বলেই বিষয়টি দেখা যায়—অন্য কিছু নয়। এই ধারায় সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কবিতার রবীন্দ্র-পরবর্তী রূপান্তরশীলতার দ্বিতীয় প্রজন্মের কবি। প্রথম প্রজন্মের কবি হিসেবে ধরা হয় কাজী নজরুল ইসলাম ও তিরিশের কবিদের।

বাংলা কবিতার রবীন্দ্রোত্তর যুগের পরিবর্তন অনুধাবন করতে হলে বিশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক রূপান্তরটাও বোঝা জরুরি। বাংলা অঞ্চলের রাজনীতি বিশ শতকে লাফিয়ে লাফিয়ে বদলাতে থাকে। এই সময় থেকেই বাংলার রাজনীতি পুরোপুরি না হলেও ক্রমে ইংরেজের হাত ফসকাতে শুরু করে। আগের ‘সরলতায়’ বাংলা শাসনের জায়গা থেকে ইংরেজ শাসকেরা ক্রমাগত সরে আসতে বাধ্য হয়। গ্রামবাংলায় কোনো মানুষ বেশি জটিল হলে তাকে ‘ব্রিটিশ’ বলা হয়—এ ধরনের ‘ব্রিটিশ’ রাজনীতির ছাপ বিশ শতক থেকেই দেখা দিতে থাকে।

এই ‘ব্রিটিশ’ রাজনীতির পাশাপাশি বিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলা অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধিতার সূত্র ধরে ‘পিপলের’ উত্থান ঘটতে থাকে। স্বদেশি আন্দোলন, অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের তৎপরতা শুরু হয় বিশ শতকের গোড়ার দিকেই। দ্বিতীয় দশকের একেবারে গোড়ার অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন এই অঞ্চলে ‘পিপলের’ উত্থান আরও স্পষ্ট করে তোলে।

এগুলো দেশীয় উদ্যোগের দিক। ভিনদেশি প্রভাবও ছিল। এর মধ্যে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ঘটে যায় সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘বলশেভিক বিপ্লব’। গণমানুষের উত্থানের পথকে এই বিপ্লব আরও ত্বরান্বিত করে—পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। বাংলা অঞ্চল এর বাইরে ছিল না। বিশের দশকের গোড়া থেকেই বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা দেখা দিতে থাকে। এই দশকের মাঝামাঝি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কনিষ্ঠ সদস্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে তাঁর কবিতা নজরুলের মতো গরিবের জন্য সহানুভূতি বা উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সর্বোপরি, বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলার মানুষের, বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মনস্তত্ত্বে, রুচিতে ও চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ফলে এই সময়ের মানুষ আর উনিশ শতকের মানুষের মধ্যে একটা বড় ব্যবধান তৈরি হয়।

জাতীয় জীবনের পরিবর্তন কবিতায় অনূদিত হওয়া অনিবার্য ছিল। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এই পরিবর্তনকে প্রথম সার্থকভাবে ধারণ করে। নজরুল মূলত বাংলা কবিতার নতুন যুগের নতুন মানুষের নতুন নন্দনরুচির নকিব। তাঁর মূল ধারার কবিতায় বহু মানুষের শোরগোল, নৈরাজ্য, স্বাধীনতার তীব্র স্পৃহা—এসবের মূলে ছিল ওই যুগের মনস্তত্ত্ব। এই সময়ে সাম্যের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে থাকে; ১৯২৫ সালেই নজরুল লিখে ফেলেন সাম্যবাদী নামে একটি পুরো কাব্যগ্রন্থ। এরপর ১৯২৬ সালে মেহনতি মানুষদের নিয়ে লেখেন সর্বহারা নামে আরেকটি পুরো কাব্যগ্রন্থ।

তবে নজরুলকে আমরা মার্ক্সিস্ট কবি বলি না। তিনি আসলে রুশ বিপ্লব, ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন এবং উদার মানবতাবাদী চেতনার এক দুর্লভ সংঘট্ট। তবু বাংলা কবিতার নজরুল-পরবর্তী প্রজন্মের মার্ক্সিস্ট অধিকাংশ কবিই নানাভাবে নজরুলের কাছে ঋণী—এতে সন্দেহ নেই।

বাংলা কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য নজরুলের পথরেখা ধরেই আবির্ভূত হয়েছেন। নজরুলের কাছে তাঁর ঋণ আছে। তবে নজরুল ও সুকান্তের মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট। প্রথম পার্থক্য রাজনৈতিক মতাদর্শের। দ্বিতীয় পার্থক্য নন্দনের। রাজনৈতিক মতাদর্শই সুকান্ত ও নজরুলের কবিতার মধ্যকার নন্দনতাত্ত্বিক পার্থক্যকে চিহ্নিত করে। নজরুলের কাব্যজীবনের শুরুতে যে কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তার বিকাশ ও মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের বেড়ে ওঠার সময়ে। সেই কারণেই সুকান্তকে নজরুলের সঙ্গে একভাবে মিলিয়ে দেখা যায় না।

সুকান্ত ভট্টাচার্য কমিউনিস্ট পার্টির কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে তাঁর কবিতা নজরুলের মতো গরিবের জন্য সহানুভূতি বা উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সুকান্তের কবিতা অত্যন্ত শ্রেণিসচেতন—এবং সেই মোতাবেক নন্দনসচেতন। তিনি কবিতা শুরুই করেছেন অঙ্গীকার দিয়ে। বলেছেন, ‘চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/ এ-বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

সুকান্তের কবিতা খুব সুস্পষ্টভাবে শ্রেণিসচেতন। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতায় শোষক-শোষিত, শত্রু-মিত্র খুবই স্পষ্ট। এই সম্পর্কের ভেদরেখা ও কার্যকারণ তাঁর প্রতিটি কবিতায় প্রখরভাবে জারি থাকে। তিনি মানবতাবাদী। কিন্তু পশ্চিমি অর্থে ‘উদার মানবতাবাদী’ নন। তাঁর কবিতায় ছোপ ছোপ রক্ত থাকে; বিপ্লবী রক্ত। হাহাকার থাকে; বঞ্চিত মানুষের হাহাকার।

সুকান্ত কবিতায় শুধু অঙ্গীকার করেননি; পুরোনো নন্দনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। অল্প বয়সেই তিনি টের পেয়েছিলেন—পুরোনো যুগের জীবনদৃষ্টি ও কাব্যভাষা নতুন যুগের সমস্যাকে ধারণ করতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সুকান্তের দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলে বিষয়টি বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের প্রতি সুকান্তের মুগ্ধতা কম নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,/ প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,/ এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি...।’ তবে সুকান্ত স্পষ্টভাবেই বলেন—তাঁর ও তাঁর যুগের বাস্তবতা এক নয়, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের যুগের বাস্তবতাও এক নয়। তিনি বলেছেন, ‘আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,/ প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।/ আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,/ আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,/ আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে,/ আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।/ তাই আজ আমারো বিশ্বাস,/ “শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।”/ তাই আমি চেয়ে থাকি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,/ দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।’

সুকান্ত রবীন্দ্রনাথকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং তাঁর পুনরায় আবির্ভাবও প্রত্যাশা করেন। কিন্তু আগের রবীন্দ্রনাথকে তিনি চান না; চান নতুন রবীন্দ্রনাথকে। কবির ভাষায়, ‘এবারে নতুন রূপে দেখা দিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে, কণ্ঠে গণসংগীতের সুর;/ জনতার পাশে পাশে উজ্জ্বল পতাকা নিয়ে হাতে/ চলুক নিন্দাকে ঠেলে, গ্লানি মুছে আঘাতে আঘাতে।’

সুকান্তের কবিতায় আবারও শ্রেণিসচেতনতার দৃষ্টিভঙ্গি খুব স্পষ্ট। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতায় শোষক-শোষিত, শত্রু-মিত্র খুবই স্পষ্ট। এই সম্পর্কের ভেদরেখা ও কার্যকারণ তাঁর প্রতিটি কবিতায় প্রখরভাবে জারি থাকে। তিনি মানবতাবাদী, কিন্তু পশ্চিমি অর্থে ‘উদার মানবতাবাদী’ নন। তাঁর কবিতায় ছোপ ছোপ রক্ত থাকে; বিপ্লবী রক্ত। হাহাকার থাকে; বঞ্চিত মানুষের হাহাকার। তবে এই বঞ্চিত মানুষ অসহায় নয়। তারা প্রতিরোধে দীপ্তিমান, যূথবদ্ধ ও সংগ্রামী। এত স্পষ্ট শ্রেণিসচেতন কবিতা তখনও সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কেউ রচনা করে উঠতে পারেননি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা মার্ক্সিস্ট কবিতা হিসেবে বাংলা কবিতাকে একটা ভিন্ন মাত্রা দেয়। জীবনবোধে আর কাব্যিক উচ্চারণে তিনি সার্বক্ষণিক মার্ক্সিস্ট কবি। তবে সুভাষের কবিতা যথেষ্ট ‘যান্ত্রিক এবং তত্ত্বশাসিত’ বলে অনেকে মনে করেন। কবিতায় মানবিক আবেগ সঞ্চারের প্রতি সুভাষের ঝোঁক খুবই কম—চিত্র ও চিত্রকল্পকে বেশি সামনে এনেছেন। ব্যক্তিগত অভিনিবেশও তুলনামূলকভাবে কম।

কবিতা লিখতেন, কিন্তু কম বয়সে মারা গিয়েছেন এমন কবির সংখ্যা বিশ্বসাহিত্যে ও বাংলা সাহিত্যে কম নেই। মহাকালের রীতি এই—সে কাউকে ছাড় দেয় না। সে করুণা-বেদনাহীন, নির্মম। প্রকৃত অবদান ছাড়া ইতিহাসে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু টিকে নেই, তাঁকে ছাড়া বাংলা কবিতার ইতিহাস পূর্ণতা পায় না।

তবে সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগ-সংরাগ নিয়েও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আহত হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন, ক্ষুব্ধ হয়েছেন, প্রতিবাদী হয়েছেন—আর কবিতার ভেতরেই তাঁর ব্যক্তিগত হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বোঝা যায়। তিনি বিপ্লব এবং শোষিত মানুষের কাতরানির মধ্যে সমানভাবে উপস্থিত। কবিতায় সুকান্তের সহৃদয় মানবিক উপস্থিতির সঙ্গে নজরুলের একটা উত্তরাধিকার কাজ করেছে বলেই মনে হয়। আর শ্রেণিসংগ্রামের মনোভাবের রূপায়ণের প্রশ্নে তিনি পূর্ববর্তী মার্ক্সবাদী কবিদেরই সগোত্র। তবে এই দুইয়ের মিশেলে যে সুকান্ত, তিনি বাংলা কবিতায় অনন্য।

সুকান্ত কেবল ব্যক্তিগত সংরাগ আর মার্ক্সীয় চিন্তারীতির অপূর্ব সংঘট্টের জন্যই বিশেষ হয়ে ওঠেননি; মার্ক্সীয় কবিতাধারায় তাঁর নিজস্ব অবদানও তাঁকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো করে রেখেছে। অবদানটি হচ্ছে, তিনি মার্ক্সীয় কবিতার ধারায় বেশ কিছু নতুন ও নিজস্ব প্রতীক নির্মাণ করেছেন। এই অভিনব প্রতীক নির্মাণ এতটাই খাঁটি যে সুকান্তের পর দীর্ঘ সময়েও বাংলা কবিতায় একই মৌলিকত্বের স্বাক্ষর আর কেউ এভাবে রাখতে পারেননি। ‘চারাগাছ’, ‘সিঁড়ি’, ‘কলম’, ‘আগ্নেয়গিরি’, ‘সিগারেট’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘চিল’, ‘অঙ্কুরিত বীজ’ ইত্যাদি বহু মৌলিক প্রতীক নির্মাণ করেছেন। এসব শব্দের মধ্যে এত কাব্যসম্ভাবনা এবং মার্ক্সীয় চিন্তা আকরিত হয়ে ছিল—সুকান্তই প্রথম উদ্ঘাটন করেন। এই প্রতীকগুলোর কাব্যিক নির্মাণপ্রক্রিয়া দেখা যায় ‘দেশলাই কাঠি’ নামের একটি কবিতা থেকে— ‘আমি একটি ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি/ এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না:/ তবু জেনো/ মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—/ বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস:/ আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।’

সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর কাব্যকীর্তি এ জন্যও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে বলে অনেকে মনে করেন। অকালমৃত্যুর কারণে এক ধরনের ছাড় পাওয়া—এই যুক্তিও অনেকে করেন। কিন্তু সেটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। কবিতা লিখতেন, কিন্তু কম বয়সে মারা গিয়েছেন এমন কবির সংখ্যা বিশ্বসাহিত্যে এবং বাংলা সাহিত্যে কম নেই। মহাকালের রীতি এই—সে কাউকে ছাড় দেয় না। সে করুণা-বেদনাহীন, নির্মম। প্রকৃত অবদান ছাড়া ইতিহাসে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু টিকে নেই; তাঁকে ছাড়া বাংলা কবিতার ইতিহাস পূর্ণতা পায় না। কারণ, তিনি একটা কালের কণ্ঠস্বরকে ওই সময়ের আধুনিক একটা কাব্যভাষায় অনুবাদ করতে পেরেছিলেন। বাংলা কবিতার বাঁকবদলে অন্যতম প্রধান হিসেবেও তিনি অবদান রেখেছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে মানুষ যত দিন অসহায় হতে থাকবে, শোষিত হতে থাকবে—সুকান্ত তত দিন বহাল ও প্রাসঙ্গিক থাকবেন বলে মনে করা হয়।