ইছামতী নদীর মাঝি গুণালের কাছে অমাবস্যার বৃষ্টিমাখা নিশিরাতটা আলাদা কোনো অচেনা রাত নয়। তবে এই রাতেই একটি যুবতী যাত্রীর মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে—লুসি। লুসির অবস্থাকে গুণাল বুঝতে পারছেন নিঃসঙ্গতার চাপে বিপন্ন একজন মানুষের মতো। নদীঘাটের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্ষুধার্ত বাঘ-ভালুক-কামোট, কুমির আর বিষধর সাপের সম্ভাব্য উপস্থিতি—গুণালের অভিজ্ঞতা তাকে সন্দেহের বাইরে রেখেই চলেছে।
তেঁতাল্লিশ বছর ধরে যে নদীতে গুণালের কারবার, সে নদীর গতিও তার চেনা; জোয়ার-ভাটার পার্থক্যও সে জল-জঙ্গলার শব্দ শুনেই ধরে ফেলে। দিনে মাছ ধরা, রাতে করে যাত্রী পারাপার—এই নিয়মেই সে অভ্যস্ত। সীমান্তরেখা পাহারা দিয়ে যে দুই দেশের টহলদল মাঝ বরাবর আসে, কখন আসে, কখন সরে যায়—এগুলোও তার জানা। কারও উদ্দেশ্য এপারে না ওপারে—হাঁটাচলা, কথা বলা, বসার ধরন দেখেও সে আন্দাজ করে নিতে পারে।
লুসির মুখটা গুণাল ভালো করে দেখেননি—এই কথাটাও সত্যি, আর তার পেছনে কারণ আছে। লুসিকে ঘাটে আনা হয়েছে অন্ধকারে, নৌকায় তোলা হয়েছে অন্ধকারে, আর বসিয়ে রাখা হয়েছে অন্ধকারেই। বিজলির আলোতে যতটা দেখা যায়, গুণাল ততটাই দেখে ফেলেছেন। চাইলে কুপি বা টর্চের আলো জ্বালিয়েই মুখটা দেখা যেত, বুঝে নেওয়া যেত বয়স আর মনোহাল। কিন্তু বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই, উপরন্তু চারদিকে গভীর নীরবতা। জলস্থলে কোথাও কেউ আছে—সেটা গুণাল নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না। কোস্টগার্ড বা বিজিবি তাকে ডেকে টহলে আসে বলেও নয়। কোথায় কোন ফাঁকে তারা ঘাপটি মেরে থাকতে পারে, সেটাও বলা যায় না।
তবে গুণাল ভাবছেন, তাকে কেউ কিছু বলবে না। একটিবার জিজ্ঞেসও করবে না—এত রাতে একা সে কী করছে নির্জন ঘাটে। কারণ টহলদারদের চোখে তার কারবার পরিচিত। জানে—জেলে-মালোরা রাত জেগে জাল ফেলে ইছামতীর মাছ তোলে। কিন্তু বৃষ্টিমুখর নিশিরাতে ছাপরায় খোলা চুলের এক নারী যদি লুণ্ঠিত পথিকের মতো জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে, তাহলে সন্দেহ জাগতে পারে। সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদ আসে; ঠিকঠাক উত্তর না মিললে দুজনের কোমরে রশি লাগানোতেও তারা দেরি করবে না।
.লুসি বলল, ‘রাতটা কাটানোর মতো কোনো একটা ব্যবস্থা কি করে দেওয়া যায়, কাকা?’.গুণাল কোনো জবাব দেয় না। কী জবাব দেবে? জল-জঙ্গলার দেশ, এদিকে তো কোনো হোটেল-মোটেল নেই যে লুসিকে রেখে আসবে। কারও বাড়িতেও রাখার উপায় নেই। পুরুষ হলে একটা কথা ছিল, এত রাতে অজানা-অচেনা একটা মেয়েলোককে কে আশ্রয় দেবে। তা ছাড়া তার মনেও হচ্ছে না এই বাদলার রাতে কোথাও কেউ জেগে আছে।
দিনের বেলা ইছামতী পার হওয়া যাবে না—এই কথাই আগে লুসি বুঝে নিয়েছিল। সে ভেবেছিল, রাত নটার আগেই নিরাপদে নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে পৌঁছে যাবে। সবুরও বলেছিল, ঠিক ততটাই সময়েই পার হওয়া যাবে। কিন্তু এখন রাত প্রায় বারোটা; টানা চার ঘণ্টা সে বসে আছে, অথচ সবুরের কোনো হদিস নেই। তার সঙ্গীরাও নেই। লুসি টের পাচ্ছে, সে যেন একটা গভীর গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। এই গর্ত থেকে বের হওয়া যে সহজ হবে না—এটাও তার বোঝা হয়ে গেছে। তবু ভয় বা দুশ্চিন্তা তাকে টলাতে পারছে না। নিজের প্রবল বিশ্বাসে সে ভাবছে, যত গভীর গর্তই হোক, সে উঠে আসবে—কেউ তাকে আটকে রাখতে পারবে না।
ওপারে পাচার হয়ে যাওয়া তার মেয়ে নিমির কোনো হদিস পাওয়া না পর্যন্ত, কিংবা মেয়েকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার আগ পর্যন্ত—লুসির কাছে কোনো বাধাই বাধা নয়, কোনো বিপদই বিপদ নয়। সন্তানের খোঁজে সে স্থল হয়ে গাধা, মাছ হয়ে জল, পাখি হয়ে আকাশ, চিতা হয়ে পাহাড়ও ডিঙাতে পারবে—এমন এক অদম্য দৃঢ়তার মধ্যে সে নিজেকে স্থির রেখেছে। এতটুকু ক্লান্তিও তাকে ধরতে পারবে না। সে কোনো সুযোগই দেবে না।
বৃষ্টির শব্দ উজিয়ে কোথাও একটানা বেজে চলে শিঁ-ই...শিঁ-ই...শিঁ-ই...। লুসির মনে হচ্ছে, আকাশ কাঁপছে—আসলে আকাশ নয়, বাতাস কাঁপছে। আবার বাতাসও নয়, মনে হচ্ছে কোনো বদ্ধ ঘরে বসে তার নিমি কাঁদছে। নিমি—এই নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বুকটা ভারী হয়ে ওঠে তার। বুকটা খামচে ধরতে থাকে বেদনার সহস্র নীল কাঁকড়া। যন্ত্রণায় সে হাঁসফাঁস করে; বুকের গহিন থেকে উঠে আসে দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাসের পরে প্রশ্ন জাগে—নিমিকে কি ঠিক এই পথেই ওরা ওপারে নিয়ে গেছে? গুণালের নৌকাতেই কি মেয়েটা এই নদী পাড়ি দিয়েছে?
হঠাৎ লুসি মেয়ের গায়ের গন্ধ টের পায়। হেয়ারের সিরামের ঝাঁজালো সেই চেনা গন্ধ—যেটা চাল মেথি, ঘৃতকুমারী আর পেঁয়াজের রস দিয়ে তৈরি করে নিমি সপ্তাহে একবার চুলে লাগাত। মনে হচ্ছে, হ্যাঁ—ঠিক এখানেই, গুণালের নৌকার ঠিক এই জায়গাটাতেই বসেছিল নিমি; এতদিন পরও যেখানে তার গায়ের গন্ধ লেগে আছে। চোখ বন্ধ করে লুসি দীর্ঘশ্বাস টেনে গন্ধটা মগজের ভেতর ছড়িয়ে দেয়, যেন সে স্মৃতিকে স্পর্শ করতে চাইছে।
গুণাল তখন বিড়ি টানছিল। আকাশের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছিল। রাত যে আরও বদলাবে, বৃষ্টি থামবে—এমন আশ্বাস তার কাছে নেই। ঘরে বউ একা; তার বাড়ি ফেরা দরকার। যত কাজই থাকুক, রাত বারোটার পর গুণাল সাধারণত বাইরে থাকে না।
.লুসি বলল, ‘রাতটা কাটানোর মতো কোনো একটা ব্যবস্থা কি করে দেওয়া যায়, কাকা?’.গুণাল কোনো জবাব দেয় না। কী জবাব দেবে? জল-জঙ্গলার দেশ, এদিকে তো কোনো হোটেল-মোটেল নেই যে লুসিকে রেখে আসবে। কারও বাড়িতেও রাখার উপায় নেই। পুরুষ হলে একটা কথা ছিল, এত রাতে অজানা-অচেনা একটা মেয়েলোককে কে আশ্রয় দেবে। তা ছাড়া তার মনেও হচ্ছে না এই বাদলার রাতে কোথাও কেউ জেগে আছে।
তবু লুসির কথা শুনেই গুণাল সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। সে দেরি না করে ছাপরার দুই পাশে তেরপল টেনে, ছাতাটা নিয়ে নিচে নামতে শুরু করে। নামার আগে বলে যায়, লুসি যেন কোনো চিন্তা না করে—কোনো সমস্যা হবে না। নৌকায় লাইটার আছে, আছে কুপি, বোতলে কেরোসিনও আছে। দরকার হলে কুপি জ্বালানো যাবে, তবে না জ্বালানোই ভালো। বলা তো যায় না, কোথায় কোন বিপদ ওত পেতে আছে। ভোরে সে সবুরের খোঁজে যাবে; সবুর না পেলে যাবে তার বন্ধু মিতুলের বাড়ি। সে না ফেরা পর্যন্ত লুসি যেন ছাপরা থেকে বের না হয়।
এই নীরবতাতেই উত্তর পেয়ে যায় লুসি। কিছুটা ত্যক্ত গলায় সে বলে, ‘তাইলে একটা কাজ করেন কাকা, আপনি আমাকে ওপারে রেখে আসেন।’
গুণাল জানতে চায়, ‘কার কাছে রেখে আসব? একাকী আপনি যাবেন কোথায়?’
লুসির জবাব, ‘সেই চিন্তা আমার। নিজের পথ নিজে খুঁজে নেব।’
গুণাল নিশ্চিত করে বলে, ‘না না, তা হয় না...তা হয় না। এই লাইনের একটা নিয়ম আছে, নিয়মের বাইরে কিছু করা যায় না। করলে সবুরের কাছে আমি কালার হয়ে যাব। তার কথা ছাড়া আপনাকে আমি রেখে এলে সে আমাকে আর কখনো বিশ্বাস করবে না। আচ্ছা, না হয় বিশ্বাস ভাঙলাম, সবুরের মন্দশক্ত কথাও শুনলাম। কিন্তু আপনার কী উপায় হবে? এক গাঙ থেকে আরেক গাঙে গিয়ে পড়বেন, কোনোমতেই কূল খুঁজে পাবেন না।’
লুসি প্রতিত্তরে বলে, ‘তাই বলে সারা রাত এখানে বসে থাকব!’
গুণাল বুঝিয়ে দেয়, ‘তা ছাড়া আর তো কোনো উপায় দেখছি না।’
মুখে উপায় না থাকার কথা বললেও গুণাল মনে মনে একটাই বিকল্প ধরে রাখে—লুসিকে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া। সে চাইলে নিয়ে যেতে পারে; আগেও অনেকবার বহু যাত্রী সে নিয়েছে। গেল মাসে, বিজিবি যখন নদীতে কড়া পাহারা বসিয়েছিল, কোনোভাবেই পার করাতে না পেরে বটিয়াঘাটায় পিতৃভূমি দেখতে আসা ওপারের দুই যাত্রীকে সে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। শেষরাতে বিজিবি পাহারা তুলে নেওয়ার পর ঘুম থেকে তুলে তাদের পৌঁছে দিয়েছিল।
কিন্তু লুসিকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তার বউ। অচেনা মেয়েলোক দেখে সন্দেহ করবে বউ—এ উদ্বেগও আছে বটে, তবে তার চেয়েও বড় কারণ গুণালের শরীরজুড়ে নানা রোগ-ব্যারাম। কদিন ধরে হাঁটাচলাতেও কষ্ট হচ্ছে; নিয়ম করে ঘুমাতে হয় ট্যাবলেট খেয়ে। এত রাতে বউকে ঘুম থেকে তুলে আনলে তার অসুস্থ শরীর আরও অসুস্থ হতে পারে। অন্যের ঝামেলা কাঁধে নিয়ে গুণাল নিজের ক্ষতি করতে চায় না। তাছাড়া এতে লাভ হবে না; সবুর লুসির জন্য অতিরিক্ত টাকা দেবে—এমনও নয়। সবুর তাকে ৫০০ টাকার বেশি এক পয়সাও দেবে না। তাই লুসি বরং নৌকাতেই থাকুক—এই সিদ্ধান্তেই সে নিশ্চিত হয়। ছাপরার দুপাশটা তেরপল দিয়ে ঢেকে দিলে বৃষ্টির ছাঁটও আর ভেতরে ঢুকবে না।
.দেরি না করে ছাপরার দুই পাশে তেরপল টেনে দিয়ে ছাতাটা নিয়ে নেমে পড়ল গুণাল। নামার আগে বলে গেল, লুসি যেন কোনো চিন্তা না করে। কোনো সমস্যা হবে না। নৌকায় লাইটার আছে, কুপি আছে, বোতলে কেরোসিনও আছে। দরকার হলে কুপি জ্বালাতে পারবে। তবে না জ্বালানোই ভালো। বলা তো যায় না কোথায় কোন বিপদ ওত পেতে আছে। ভোরে সবুরের খোঁজে তার বাড়িতে যাবে গুণাল। সবুরকে পেলে তো ভালো, না পেলে তার বন্ধু মিতুলের বাড়ি যাবে। সে না ফেরা পর্যন্ত লুসি যেন ছাপরা থেকে বের না হয়।.
এরপর গুণাল কালভার্টের দিকে এগিয়ে যায়। নিশুতি রাতে চলতি পথে বারবার পেছনে ফিরে তাকানো বিপদের কারণ হতে পারে—এই ভেবে ইচ্ছা সত্ত্বেও সে পেছনে তাকায়নি। শেষ পর্যন্ত কালভার্টটার ওপর উঠার পর আর আটকে রাখতে পারেনি। বিজলির চমকে আবছা হয়ে দেখে নৌকাটিকে। কয়েক মুহূর্ত তালগাছটার মতো দাঁড়িয়ে থেকে জোর কদমে হাঁটা ধরল ঘাটের দিকে।
ঘাটে গিয়ে নৌকার গলুইর কাছে দাঁড়িয়ে জোর গলায় হাঁক দেয়—‘বেটি!’
ভেতর থেকে আসে লুসির সাড়া, ‘আপনি এখনো যাননি, কাকা?’
গুণাল নৌকায় উঠে তেরপলটা সরিয়ে বলে, ‘তোমাকে একা রেখে বাড়ি যেতে মন সায় দিচ্ছে না। চলো মা, আমার সাথে চলো।’
এরই মধ্যে গুণাল বুঝতে পারছে, ঘুরে দাঁড়ানো মানে শুধু পথ বদলানো নয়; গন্তব্যে পৌঁছেও নানা ভয় কাজ করে। গরানবনের ভেতর দিয়ে সরু পথ ধরে বনবিবির থান পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠে গুণাল দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবছিল গরিব ঘরে বিয়ে দেওয়া ছোট মেয়ে বুবলির কথা—যার ঘর গেল তুফানে ধসে গেছে। ঠেকাঠুকা দিয়ে কোনো রকমে দাঁড় করিয়ে রেখেছে; আবার তুফান হলে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্ষা ফুরানোর আগেই মেরামত করা যাবে না। এই তুমুল বৃষ্টির রাতেই বালবাচ্চা নিয়ে মেয়েটা কেমন আছে—ঘরে পানি ঢুকছে কি না, ঠিকমতো রান্নাবাড়া করতে পারছে কি না—সবই যেন গুণালের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
তার মনেই আবার ফিরে আসছিল লুসির কথা। সাইক্লোন শেল্টারের দিকে যেতে গিয়ে গুণালের অস্বস্তি বাড়ে—নৌকায় সে একটি যুবতী মেয়েমানুষ রেখে এসেছে। কেউ তাকে দেখবে না, তবু যদি দেখে ফেলে—এই ভাবনা। আবার লুসি কোনো দরকারে হারিকেন জ্বালালে বিজিবি বা কোস্টগার্ড সন্দেহবশত নৌকা তল্লাশি করতে পারে—এই আশঙ্কাও তাকে দমে যেতে বাধ্য করে।
দ্বিধান্বিত অবস্থায় সে পেছনে ফিরে তাকায়; গলায় আটকে থাকা কাঁটার মতো মনের অস্বস্তি আরও বাড়তে থাকে। তবে সে নিজেকে সামলে নেয়—দেখে ফেললেই বা কী; নৌকা তল্লাশি করলেই বা কী—সে ভুল করেও বলবে না এই নারী তার চেনা, বা সে নৌকায় আশ্রয় দিয়েছে। এইভাবে মন থেকে সব অস্বস্তি ঝেড়ে আবার পা বাড়ায়।
স্কুলের মোড় পার হয়ে মরা তালগাছটার কাছাকাছি যেতেই সে আচমকা শুনতে পায় মেয়েলি কণ্ঠের ডাক—‘আব্বু!’। বিজলির আলোয় একঝলক দেখতে পেল কালভার্টটার ওপর কলাপাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে বুবলি বা বুবলির মতো কেউ একজন। বিচলিত গুণাল তৎক্ষণাৎ টর্চের আলো জ্বালায়। না—কালভার্টের ওপর কেউ নেই। কোনো মানুষ নেই, নেই কোনো পশু, নেই কোনো গাছপালা। টর্চের আলোটা নেভাতেই সে আবার শুনতে পায় সেই আর্তস্বর—‘আব্বু!’ এবার তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে দোয়া-দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দেয়।
কিন্তু পা দুটি আর চলতে চায় না। কদম ফেলে আর তুলতে পারে না; যেন পাঁককাদায় বারবার আটকে যাচ্ছে। সবশেষেও সে আবার হাঁটতে শুরু করে, যেন অস্বস্তিকে পেছনে ফেলে নির্ধারিত পথে পৌঁছাতে পারে। সে তখনই বুঝতে পারে—এই নিশুতি রাতে পেছনে ফিরে তাকানো কতটা বিপদের কারণ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কালভার্টটার ওপর ওঠার পর না তাকিয়ে পারল না; বিজলির চমকে আবছা দেখতে পেল নৌকাটি। তারপর আবার জোর কদমে ঘাটের দিকে ছুটল, এবং নৌকার কাছে এসে হাঁকল—‘বেটি!’
অবশেষে গুণালের প্রত্যাবর্তন লুসির কণ্ঠে থামে—‘আপনি এখনো যাননি, কাকা?’ এরপর তেরপল সরিয়ে সে বলে, ‘তোমাকে একা রেখে বাড়ি যেতে মন সায় দিচ্ছে না। চলো মা, আমার সাথে চলো।’