একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শোভা পেত বাঁশের তৈরি নানা সামগ্রী। পলো, ঝাঁকা, ঝুড়ি ও চাটাইয়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তৈরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন অসংখ্য কারিগর। তবে বর্তমানে বাঁশের উৎপাদন হ্রাস, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পুঁজির অভাব এবং আধুনিক বাজারব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প।

ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের মল্লিকপাড়া গ্রামটি ‘বাঁশপল্লী’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার বাসিন্দারা বংশপরম্পরায় বাঁশের পণ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত। বর্তমানে গ্রামের প্রায় ১৫০টি পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে কারিগরদের কর্মযজ্ঞ। বাঁশ সংগ্রহের পর তা কেটে চটা তৈরি করা হয় এবং এরপর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় ঝাঁকা, টাপা, ঝুড়ি ও চাটাইসহ বিভিন্ন পণ্য। এই কাজে পুরুষের পাশাপাশি পরিবারের নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

তবে বর্তমানে কারিগরদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচামালের অভাব। বাঁশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কয়েক বছর আগের তুলনায় এর দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে যে বাঁশ ৩০ থেকে ৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপাদিত পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি।

স্থানীয় ব্যাপারীরা কারিগরদের কাছ থেকে ৭০ থেকে ১৫০ টাকায় পণ্য কিনে নেন, যা বাজারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। ফলে দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যায্য আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন না কারিগররা।

আধুনিক বাজারব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতাও এই শিল্পের একটি বড় সীমাবদ্ধতা। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে কারিগররা সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। আধুনিক নকশায় পণ্য তৈরি, মূল্য নির্ধারণ, অনলাইন বিক্রি ও বাজারজাতকরণের কৌশল অনেকেরই অজানা। ফলে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

পাশাপাশি পুঁজির সংকট এই শিল্পের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা না থাকায় অনেক কারিগর জীবিকার তাগিদে এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন প্রাচীন এই কারুশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।

বাঁশ কারিগর ফয়সাল মল্লিক বলেন, “সহজ শর্তে ঋণ, বাঁশের সহজলভ্যতা, আধুনিক নকশা ও পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ পেলে এ শিল্পকে আবারও লাভজনক করে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক বিপণনের সুযোগ তৈরি হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতাদের কাছে আমাদের পণ্য পৌঁছে দেওয়া যেত।”

এই বিষয়ে ফরিদপুর বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. আহসান কবির বলেন, “ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বিসিক সবসময় সহযোগিতা করে থাকে। বিসিকের উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে বাঁশশিল্পের কারিগরদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি তারা শিল্পের পরিধি বাড়াতে চাইলে বিসিকের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও করা হবে।”