একাত্তরের স্মৃতি ধরে রাখা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ অবশেষে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি এবং আত্মদানকারী ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের কথা তুলে ধরতে ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খুলে দেওয়া হলো।

নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ উন্মুক্ত করেন জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় ৩ দশমিক ৬১ একর জমিতে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি টাকা। পরে কয়েক দফা মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তবে কাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন স্থাপনাটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে আশুগঞ্জে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ১৬ কোটি টাকা ধরা হয়। ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৪৭ কোটি টাকা করা হয়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় আরও বাড়িয়ে ৭২ কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়; ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। এরপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতীয় সৈন্যরাও যোগ দেন। যুদ্ধে সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে চোখে পড়ে আশুগঞ্জের কামাউরা এলাকায় নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’। প্রবেশের দুটি ফটক রয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই পশ্চিমাংশের দেয়ালে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খোদাই করা চিত্র দেখা যায়। সেখানে সিকান্‌দার আবু জাফরের কবিতা থেকে লেখা ‘আমার কাঁধেই নিলাম তুলে তোমার যত বোঝা, তুমি আমার বাতাস থেকে মুছো তোমার ধুলো, তুমি বাংলা ছাড়ো’। পাশেই খোদাই করা রয়েছে ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম’, ‘জয় বাংলা’ ও ‘এ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’।

দক্ষিণ দিকের পার্কের পশ্চিমাংশের দেয়ালে ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের শিকল, কারাগারের বন্দিদশা, ১৯৬২ সালের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের প্রতিবাদ এবং জাতীয় নেতাসহ নানা ছবি খোদাই করা আছে। দক্ষিণ দিকের পার্কের পূর্ব পাশের দেয়ালে অস্ত্র হাতে মিত্রবাহিনীসহ তাদের হেলিকপ্টার-যুদ্ধবিমান-গোলাবর্ষণের অস্ত্র ও ট্যাংক এবং রেডিও ও অস্ত্র হাতে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের চিত্র রয়েছে।

মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচের চারপাশে ব্রোঞ্জে (পিতল) লেখা আছে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাসদস্যদের নাম। সেখানে ১ হাজার ৪৮২ জন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদের সদস্য, ভারতীয় ইস্টার্ন থিয়েটার সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ২৯ জন সদস্য, ভারতীয় ইস্টার্ন থিয়েটার বিমানবাহিনীর ১১ জন, ভারতীয় নৌবাহিনীর ৬ জন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ জন কর্মকর্তা এবং জেসিও পর্যায়ের ৭০ জন সদস্যের নাম রয়েছে।

প্রকল্পের দুটি ফটকের মাঝখানে একটি পানির ফোয়ারা করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের পশ্চিমাংশে ৮টি এবং পূর্ব পাশে ১০টি এবং স্মৃতিস্তম্ভের পেছনে ১৪টি দোকান (ফুড কোর্ট) ও একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের নিচে অফিস ও সংগ্রহশালা বা জাদুঘর আছে। পেছনে শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্কও রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগ স্মৃতিস্তম্ভ ও শিশুদের জন্য নির্মিত পার্কটি ২০২৪ সালে আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে। ভেতরে ২৭টি দোকানসহ এর রক্ষণাবেক্ষণে মাসে প্রায় আট লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডেভেলপারসের সূত্রে জানা গেছে, স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে কার্পেট খাস, বিভিন্ন ধরনের হেজ (দেয়ালের ওপর সবুজ ঘাস), রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া ও সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, এটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু সবাই একত্র হতে পারছে না। আর সাধারণ মানুষ এটি দেখার জন্য ভীষণ উৎসাহী। পাশাপাশি ধুলাবালু পড়ে এটি নষ্ট হচ্ছে। তাই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এটি খুলে দেওয়া হয়েছে। আপাতত মানুষের প্রবেশমূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইজারা দেওয়া হবে অথবা প্রশাসন নিজেই এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সময়েই স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের ধুলাবালু এবং আশপাশের চাতালকলের কালো ধোঁয়া ও তুষে স্মৃতিস্তম্ভের দেয়াল, স্থাপনা ও পরিবেশ মলিন হয়ে পড়েছিল। বছরখানেক আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশ এলাকার চাতালকল অন্যত্র সরানোর জন্য আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে চিঠি দেওয়া হয়।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব আবুল হাশেম আজাদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর দেড় হাজারের বেশি সদস্য ভুল তথ্য পেয়ে এখানে এসে পাকিস্তানি বাহিনীর অ্যাম্বুশের হামলায় নিহত হন। নতুন প্রজন্ম এসব দেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। তবে চাতালকলের জন্য স্মৃতিস্তম্ভটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অনেক কঠিন।