ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বোলিং-নৈপুণ্যে ভর করে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের পেস আক্রমণে চাপে পড়ে, আর সে চাপে প্রথম সেশনেই ভাঙতে থাকে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের গতি। প্রথম সেশনে ৭৪ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়া দল টেস্টের প্রথম দিনেই ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। এই বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল হাসান মাহমুদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের পেসারদের।
দ্বিতীয় সেশনেও অস্ট্রেলিয়া আর সামলে উঠতে পারেনি; তারা আরও ৪ উইকেট হারায়। দিনের শেষ সেশনের মাত্র ৫ ওভার ব্যাটিং করতে পেরেছে অস্ট্রেলিয়া।
লাইনের দৈর্ঘ্য ধরে টানা ভালো জায়গায় বল করে যাওয়ার ফল পেতে টেস্টে তৃতীয়বারের মতো ৫ বা তার বেশি উইকেট পেয়েছেন হাসান। যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের ক্ষেত্রে এটি প্রথম পাঁচ উইকেট—তিনি ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ের নজির গড়েন। এক প্রান্তে তাঁর অব্যাহত চাপ অন্য প্রান্তের বোলারদের কাজ সহজ করে দেয়।
বাকি চারটি উইকেটও ভাগাভাগি করে নেন তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন। এতে টেস্টে দ্বিতীয়বারের মতো এক ইনিংসে বাংলাদেশের পেসাররা প্রতিপক্ষের ১০ উইকেট নিয়েছে। আগের ঘটনাটি ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে; সেখানেও হাসান ৫ উইকেট নিয়েছিলেন।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নেমে নানা ‘দর্শক’ পাচ্ছে বাংলাদেশ। মার্ভ হিউজ, মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, জেসন গিলেস্পি, ম্যাথু হেইডেন, সাইমন ক্যাটিচ—কে নেই এখানে! এই সিরিজে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল আর রেডিও স্টেশনের হয়ে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ক্রিকেটাররা।
বাংলাদেশের পেসারদের পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ মার্ভ হিউজ। চা–বিরতির সময় লাউঞ্জে টুকটাক কথা হয় তাঁর সঙ্গে। ধারাভাষ্যকার হিসেবে চুক্তি থাকায় বেশি কথা বলেননি তিনি, তবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ফাস্ট বোলার হাসান মাহমুদকে দুই শব্দে প্রত্যয়ন করেন ‘টু গুড বোলার’ বলে। পরে প্রশংসা করেন অন্যদেরও, ‘বাংলাদেশের পেস বোলিংটাই এখন অনেক ভালো।’
সকালে টসের পর মারারা স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ট্রাভিস হেড বলেছিলেন, ‘উইকেট দেখে বেশ শক্ত মনে হচ্ছে, যথেষ্ট ঘাসও আছে।’ পেসাররা সুবিধা পাবে—এটা জানা কথাও বটে। তবে সে সুবিধা যে বাংলাদেশের পেসাররা এত কার্যকরভাবে কাজে লাগাবে, সেটি হয়তো ভাবতে পারেননি হেড-প্যাট কামিন্সরাও। নতুন বলে বোলিং শুরু করে তাসকিন আহমেদ ও হাসান অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তিতে রাখেন। প্রথম ওভারে তাসকিনের বলে পরাস্ত হন হেড। পরের ওভারে ডারউইনের ঘরের ছেলে জেক ওয়েদারাল্ডকে একই অস্বস্তিতে ফেলেন হাসান।
পুরো ইনিংসেই পেসারদের কাছ থেকে উইকেট-উপযোগী মুভমেন্ট এবং বাউন্স পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। হাসান নিয়মিত ভালো লেংথে বল করে যান এবং দুই দিকেই সুইং করান। মাঝেমধ্যে এমন বলও দেন যা শট খেলার মতো ইঙ্গিত দেয়; তারই ফল হিসেবে ১২তম ওভারে ওয়েদারাল্ডকে উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে কট বিহাইন্ড করিয়ে একটি উইকেট আদায় করেন।
হাসানের বোলিংয়ের দাপট দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়। নিজের দ্বিতীয় উইকেট, মানে ট্রাভিস হেডকে ফেরানোর পর থেকেই তিনি প্রেসবক্সে অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ইংলিশ কাউন্টিতে ভালো বোলিং করে আসা হাসানের ব্যাপারে কেউ কেউ তখন বাড়তি খোঁজখবরও নিচ্ছিলেন।
দিনের শুরুতেই ৭ ওভারের প্রথম স্পেলে ২৫ রান দিয়ে ২ মেডেনসহ ২ উইকেট নিয়ে হাসান অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলেন। এরপরও সেই ধারা অব্যাহত থাকে; তিনি আরও ৪ উইকেট নেন। নিজের ৬ উইকেটের মধ্যে কোন উইকেটটাকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাববেন—স্টিভেন স্মিথের উইকেটটিই হয়তো সে তালিকায় থাকবে।
ব্যক্তিগত ২ রানে স্লিপে তানজিদ জীবন পাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস কার্যত একাই টেনে তোলার চেষ্টা করেন স্মিথ। হাসানকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারতে গিয়ে আকাশে ক্যাচ তুলে দেওয়ার আগে করেছিলেন ১০৯ বলে ৭১ রান।
হাসানের আউটগুলোর ধরনও বোঝায়, তিনি কতটা কাজে লাগিয়েছেন উইকেটের সুবিধা। প্রথম চার উইকেটের মধ্যে একটি বোল্ড, অন্য তিনটি উইকেটের পেছনে লিটনের হাতে ক্যাচ।
ডারউইনের সবুজ উইকেটে উজ্জ্বল ছিলেন তাসকিন আর ইবাদতও। প্রথম সেশনে তাঁদেরও একটি করে উইকেট ছিল। তবে হাসানের মতো ইবাদতও ২ উইকেট নিয়ে লাঞ্চে যেতে পারতেন যদি ১৭তম ওভারে স্মিথের ওই ক্যাচটা তানজিদ না ছাড়তেন। জীবন পেয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা যে করা হয়েছে, তা স্মিথের ৭১ রানের ইনিংসেই স্পষ্ট। একটি ছক্কার সঙ্গে সাত বাউন্ডারি—বাংলাদেশের বোলারদের সামনে একমাত্র তাঁকেই কিছুটা স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে।
ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলেই শূন্য রানে আউটের সুযোগ পেয়েও বেঁচে যান ওপেনার তানজিদ। জশ হ্যাজলউডের বলে টি-টুয়েন্টি সুলভ এক শট খেলে বল তুলে দিয়েছিলেন আকাশে। তবে ক্যাচটা ধরতে পারেননি নাথান লায়ন। পরের ওভারের প্রথম বলে তেড়েফুঁড়ে মারতে গেছেন আরেক ওপেনার সাদমান ইসলামও। মিচেল স্টার্কের বলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ড্রাইভ খেলতে চাইলেন যেন রান করার তাড়া—এমন অনুভবও ছিল তাঁর শটে।
এরপর দুজনই কিছুটা থিতু হন। তবে দিন শেষ করতে পারেননি। নবম ওভারে স্টার্কের ১৪৩.৪ কিলোমিটার গতির একটি বলে ঠিকঠাক ব্যাট লাগাতে না পারায় ফেরেন তানজিদ—৩০ বলে ২০ রান করে কাভার পয়েন্টে লায়নের হাতে ক্যাচ দিয়ে।
৩২ রান নিয়ে আরেক ওপেনার তানজিদ দিন শেষ করেন ৩৫ রানে অপরাজিত থাকা অভিজ্ঞ মুমিনুল হকের সঙ্গে। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৬০ রানের জুটিতে শুধু সাদমানের উইকেটটি হারিয়েই ৯৬ রান করে বাংলাদেশ। হাসান মাহমুদের হাত ধরে আসা দারুণ দিনটি তাই প্রথম দিন শেষেও উজ্জ্বলভাবেই টিকে থাকে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৯৮ (স্মিথ ৭১, ওয়েদারাল্ড ২৩, হেড ২২, ক্যারি ১৯; হাসান ৬/৫৫, ইবাদত ২/৩৯, তাসকিন ২/৫৫, মিরাজ ০/১২, তাইজুল ০/২৪)।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৪ ওভারে ৯৬/১ (মুমিনুল ৩৫*, তানজিদ ৩২*, সাদমান ২০; স্টার্ক ১/২৮, হ্যাজলউড ০/১৯, কামিন্স ০/১৪, গ্রিন ০/১২, লায়ন ০/১৬)।—প্রথম দিন শেষে।