মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নে সাড়ে তিন কিলোমিটার কাঁচা সড়কের কারণে থমকে গেছে আটটি গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে সড়কটি পাকায় করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটিতে পানি জমে কাদা ও অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়। ফলে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে স্থানীয়দের জন্য।

এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, সড়কটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বড় খালপাড়, জয়াইর, হাদুল্লাপুরসহ আশপাশের অন্তত ৮টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ বছরের পর বছর এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমজীবীসহ প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই পথে যাতায়াত করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়, যা রাতের বেলায় আরও প্রকট হয়। বর্ষায় রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বাধ্য হয়ে অনেকে জুতা হাতে নিয়ে কাদা পেরিয়ে পথ চলেন, আবার অনেকে বৃষ্টির দিনে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ রাখেন।

স্থানীয় বাসিন্দা শৌরভ হোসেন বলেন, “শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বৃষ্টি শুরু হলেই মনে হয় আমরা মূল জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, বাজারে যাওয়া কিংবা অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়া—সবকিছুতেই উৎকণ্ঠা নিয়ে থাকতে হয়।”

আরেক বাসিন্দা জাকির শেখ বলেন, “বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গেলেও এখন ভাবতে হয়। বর্ষার সময় বরযাত্রী বা অতিথিদের গাড়ি বাড়ি পর্যন্ত আসতে পারে না। ফলে সড়কটি এখন আমাদের সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

এই পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরাও। উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া কিংবা কৃষি উপকরণ বাড়িতে আনা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। যানবাহন না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়।

ভ্যানচালক তমিজউদ্দিন বলেন, “রাস্তার যে অবস্থা, ভ্যান নিয়ে যাতায়াত করা খুব কঠিন। সাধারণ মানুষ এ রাস্তা দিয়ে যেতে পারে না, আমাদের আয়-রোজগারও বন্ধের পথে। সরকার যদি রাস্তাটা পাকা করে দেয়, তবে আমরা বেঁচে যাই।”

কৃষক আলী হোসেন মিয়া বলেন, “এখান থেকে কৃষিপণ্য হাটে নিয়ে যেতে খুব কষ্ট হয়। এই মৌসুমে পাট নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কাদার জন্য ভ্যান চলতে চায় না। রাস্তাটি দ্রুত মেরামত করা জরুরি।”

দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে সম্প্রতি সড়কটি স্থায়ীভাবে পাকায় করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের দাবি, নামমাত্র মাটি ফেলে সংস্কার নয়, বরং টেকসইভাবে সড়কটি নির্মাণ করতে হবে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্রবীণরা জানান, আট গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দ্রুত পাকা করা হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আগামী বর্ষার আগেই কাজ শুরু না হলে এই দুর্ভোগ শেষ হবে না।

মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহরাব খান বলেন, “সড়কটির বেহাল অবস্থার বিষয়টি আমার জানা আছে। বর্ষায় মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, বাজেট পেলেই কাজ শুরু হবে।”

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “এলাকাবাসীর দাবির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। সড়কটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”