রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের লাল সিরামিক ইটের ভবনের নিচতলার লবিতে চলছে এক বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী। স্টিলের কাঠামোর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা বড় আকারের ছবিগুলোতে ফুটে উঠেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থাপত্যের নান্দনিকতা। কোনো কোনো ভবন পরিপাটি, আবার কোনোটি আরণ্যক পরিবেশের মাঝে লাল-সবুজের কাব্যিক ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে। স্থপতি ও আলোকচিত্রী নিকলাউস গ্র্যাবার দেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ স্থপতি মাজহারুল ইসলামের স্থাপনাগুলোর ওপর এই প্রদর্শনী সাজিয়েছেন।
‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীটি মূলত নিকলাউস গ্র্যাবারের গবেষণামূলক বই ‘স্পেসেস অব বিলঙ্গিং: দ্য আর্কিটেকচার অব মাজহারুল ইসলাম’ (কোয়ার্ট ভারলাগ, লুসার্ন ২০২৫)-এর আলোকচিত্রগুলোর সংকলন। এখানে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ১০টি বিখ্যাত স্থাপনা প্রকল্পের ২৪টি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ এই আয়োজনে সহায়তা করেছে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভের তত্ত্বাবধায়ক সহযোগী অধ্যাপক মুহতাদিন ইকবাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই ছবিগুলো নিয়ে তাদের মোট ১০টি প্রদর্শনী আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রদর্শনীগুলো হবে স্থপতি মাহজারুল ইসলামের করা ওই স্থাপনাগুলোয়। জাতীয় গ্রন্থাগারে দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি হচ্ছে। এটি শুরু হয়েছে ৮ আগস্ট, আগামীকাল ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার শেষ হবে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।
এর আগে গত ২৫ এপ্রিল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশে নিকলাউস গ্র্যাবারের বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এরপর প্রথম প্রদর্শনীটি করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে তৃতীয় প্রদর্শনীটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চতুর্থটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় জনপ্রশাসন ইনস্টিটিউট (নিপা), কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার, জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (বগুড়া, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বরিশাল)—এই ১০টি প্রকল্পের ২৪টি আলোকচিত্র।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের (১৯২৩-২০১২) কাজ সম্পর্কে নিকলাউস গ্র্যাবার বলেছেন, “তিনি তাঁর কাজে বাংলাদেশে এমন এক অসামান্য স্থাপত্য ঐতিহ্য রেখে গেছেন, যার প্রাসঙ্গিকতা সময় ও ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে পৌঁছেছে। তাঁর এসব যুগান্তকারী ও কালজয়ী কাজগুলোয় তিনি বাস্তববাদ ও কাব্যিকতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যে স্থাপন করতে পেরেছেন।”
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্থাপত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করছেন নিকলাউস গ্র্যাবার। তাঁর বইটিতে মাজহারুল ইসলামের কাজের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি অনন্য স্থাপত্যকর্মের আলোকচিত্র এবং মূল নকশার বিস্তারিত প্রতিলিপি দেওয়া হয়েছে। প্রদর্শনীতে এই বইটিও রাখা হয়েছে।
সুইস স্থপতি নিকলাউস গ্র্যাবার ইটিএইচ জুরিখ এবং নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে অবস্থিত ‘গ্র্যাবার অ্যান্ড স্টাইগার আর্কিটেক্টস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং লুসার্ন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া তিনি ঢাকার বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টসে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন। গবেষণার প্রয়োজনে বহুবার বাংলাদেশ সফর করা গ্র্যাবার আন্তর্জাতিকভাবে এই বিষয়ে প্রকাশনা ও বক্তৃতা দিয়ে আসছেন।