সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে দুই শিশুসন্তানকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হাওরের পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। পুলিশ অভিযুক্ত বাবাকে আটক করেছে এবং হাওর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, সন্তানদের দুষ্টুমিকে কেন্দ্র করে স্ত্রী ও শাশুড়ির মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধে অতিষ্ঠ হয়ে ওই ব্যক্তি এই নৃশংস কাজ করেছেন এবং পরে সন্তানদের নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজান।
আটক ব্যক্তির নাম কামরুল ইসলাম (৩০), বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া মধুপুর গ্রাম। পুলিশ আজ বুধবার দুপুরে তাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল তাঁর দুই সন্তান—মুহাদ্দিস (৭) ও তুলনা (৪)-কে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, কামরুলের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়; তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি ফেরি করে জীবনযাপন করতেন।
আজ দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের গোবিন্দপুর এলাকায় মুহাদ্দিসের মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে শান্তিগঞ্জ উপজেলার বড়কাপন এলাকায় তুলনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ জানান, দুই শিশুর লাশ বর্তমানে সদর থানায় রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে দিরাই থানা পুলিশ পেরুয়া গ্রামে গিয়ে কামরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে। তাঁর কথাবার্তায় সন্দেহ হলে পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এরপরই তিনি পুরো ঘটনার কথা খুলে বলেন।
আটক কামরুলের বরাত দিয়ে দিরাই থানা পুলিশ জানায়, তাঁর চার সন্তান। সন্তানদের দুষ্টুমি করলে মা আফরোজা বেগম তাদের মারধর করতেন, যা নিয়ে কামরুলের মা ফুলজান বিবির সঙ্গে আফরোজার প্রায়ই ঝগড়া হতো। গত শুক্রবার সকালে এই মারধরের ঘটনা নিয়ে বউ-শাশুড়ির মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। জুমার নামাজ শেষে কামরুল বাড়ি ফিরে জানতে পারেন যে, আফরোজা তাঁর মাকে মারধর করেছেন। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি হয় এবং ভাত দিতে বললে আফরোজা তাঁকে গালিগালাজ করেন। এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে কামরুল বিকেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে মুহাদ্দিস ও তুলনাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সিলেটে চলে যান।
পুলিশ আরও জানায়, সিলেটে দুই দিন থাকার পর গত রোববার সুনামগঞ্জে ফেরার পথে কামরুল সন্তানদের ঘুমের ওষুধ খাওয়ান। সন্ধ্যায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার বরকাপন এলাকায় গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে তুলনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হাওরে ফেলে দেন। এরপর মুহাদ্দিসকে নিয়ে সদর উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকায় গিয়ে তাকেও হাওরে ফেলে দেন। রাতে বাড়ি ফিরে তিনি এলাকায় প্রচার করেন যে তাঁর দুই সন্তান নিখোঁজ হয়েছে এবং থানায় জিডি করেন। স্থানীয়রা তখন ফেসবুকে দুই শিশুর সন্ধান চেয়ে পোস্ট করতে থাকেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দিরাই থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "পারিবারিক কলহের জেরেই সন্তানদের হত্যা করেছেন বলে কামরুল নামের ওই ব্যক্তি স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হবে।"