সিলেট নগরের রায়নগর আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের গৃহকর্মীসহ তিনজনের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে নিহত দম্পতির সন্তানরা আমেরিকা থেকে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
নিহতরা হলেন—সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য এম আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা (১৬)। নিহত সাত্তারের আদি বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে এবং গৃহকর্মী তাহমিনার বাড়ি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বরইকান্দি গ্রামে। মাত্র দেড় মাস আগে তাহমিনা ওই বাসায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে রায়নগরের ‘মিতালী ১১১’ নম্বর বাসার (নিকুঞ্জ ভিলা) দোতলায় এই ঘটনা ঘটে। বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার সময় বাসায় এই তিনজন ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। সাত্তার দম্পতির ছেলে রাহিন মোস্তফা ও ছোট মেয়ে আমেরিকায় এবং অপর দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
প্রতিবেশীদের বিবরণ অনুযায়ী, সকালে বাসা থেকে একবার জোরে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা গিয়েছিল। তবে আব্দুস সাত্তার প্রায়ই উচ্চস্বরে কথা বলতেন বলে তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। ওইদিন সকালে রঙের মিস্ত্রি এসে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দোতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে রক্ত বেয়ে পড়তে দেখেন এবং প্রতিবেশীদের জানান। পরে বিষয়টি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনারের নজরে আসে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে এবং ভেতরে প্রবেশ করে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, একটি কক্ষ থেকে সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মীর এবং অন্য একটি কক্ষ থেকে আব্দুস সাত্তারের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাওয়া গেছে। প্রত্যেকের গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় এলাকাটিতে বিদ্যুৎ না থাকায় সিসি ক্যামেরায় কোনো ফুটেজ ধারণ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের বিশেষ টিম, সিআইডি ও পিবিআইয়ের ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে একটি স্পেশাল তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "পরিবারের ব্যবহৃত ওয়ারড্রোব ও আলমারিগুলো খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। সেখান থেকে স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান কিছু খোয়া গেছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে একটি জমি-সংক্রান্ত দলিল পাওয়া গেছে, যা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এটি ডাকাতি, নাকি পারিবারিক কোনো শত্রুতা বা পূর্ববিরোধ—সব দিক বিবেচনা করেই তদন্ত চলছে।"
এদিকে, বাসার গাড়িচালক ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস আগে আব্দুস সাত্তার নিচতলার এক ভাড়াটিয়াকে জোরপূর্বক বিদায় করে দেন। দীর্ঘ ছয় মাস ভাড়া না দেওয়ায় তিনি পুলিশ ও মহল্লার সমিতির সহায়তা নিয়েছিলেন। এই ঘটনার সঙ্গে ওই ভাড়াটিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
দুপুরে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পুলিশ আশা প্রকাশ করেছে যে, দ্রুতই এই হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।