সিলেট নগরের রায়নগর আবাসিক এলাকার একটি বাসায় ব্যবসায়ী, তার স্ত্রী এবং এক গৃহকর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা হলেন সিলেট চেম্বারের সদস্য ও ব্যবসায়ী এম আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা (১৬)। রায়নগর আবাসিক এলাকার মিতালী ১১১, নিকুঞ্জ ভিলার দোতলায় তাদের বাসা ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এড়াতে অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎহীন এই সময়ের সুযোগ নিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। পুরো এলাকা এবং ওই বাসা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো ফুটেজ ধারণ হয়নি।
পুলিশ জানায়, বাসার একটি কক্ষে সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনার এবং অন্য একটি কক্ষে আব্দুস সাত্তারের মরদেহ পাওয়া যায়। প্রত্যেকের গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন থাকলেও ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, স্থানীয় এক ব্যক্তির ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তিনি বলেন, "সকালে বাসার দরজা বন্ধ দেখে এবং দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে স্থানীয় একজন তাকে ফোন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসার ভেতর থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।"
তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, "ক্রাইমসিন দোতলা পর্যবেক্ষণ করছি। পিবিআই ও সিআইডির যারা ক্রাইমসিন নিয়ে কাজ করেন, তারাও পরিদর্শন করেছেন। একটি স্পেশাল টিম গঠন করে দিয়েছি তদন্ত করার জন্য।"
ঘটনার সময়কাল নিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, "ভাড়াটিয়াদের বক্তব্য অনুযায়ী সকালে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা গিয়েছিল। এ কারণে হত্যাকাণ্ডটি সকালেই ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।"
প্রতিবেশীরা জানান, সকালে একবার জোরে আওয়াজ শোনা গেলেও আব্দুস সাত্তার বয়স্ক হওয়ায় প্রায়ই জোরে কথা বলতেন, তাই তারা বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। এদিকে নিচতলার ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ায় সেখানে রংয়ের কাজ চলছিল। সকালে রংমিস্ত্রি এসে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে এবং বেলকনি দিয়ে রক্ত পড়তে দেখে পুলিশে খবর দেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় এক মাস আগে নিচতলার এক ভাড়াটিয়াকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে তাকে বাসা ছাড়তে বলা হলেও তিনি তা করছিলেন না, যার ফলে আব্দুস সাত্তার স্থানীয় সমিতি ও পুলিশের সহায়তা নিয়েছিলেন। নিহত দম্পতির ভাগ্নে মুন্না মিয়া জানান, ওই ভাড়াটিয়া জায়গা-জমির ব্যবসা করতেন। তার ভাষ্য, "মামা নিজেই মহল্লার কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে বলেছিলেন, আমার বাসা ছাড়েন না, ভাড়াও ঠিকমতো দিতেন না।"
এই বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, "ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, নাকি এর পেছনে পারিবারিক শত্রুতা বা কোনো পূর্ববিরোধ রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।"
তিনি আরও জানান, "বাসার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। সেখান থেকে স্বর্ণালংকার বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিসপত্র সরানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি দলিলও পাওয়া গেছে। সেটিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।"
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এ বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি।"
নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার এলাকার বরইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা আপ্তাব মিয়া ও মা নাজমা বেগম। পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের পর প্রায় দেড় মাস আগে তিনি এই বাসায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী মিতালী আবাসিক এলাকার আদি বাসিন্দা। আব্দুস সাত্তার ব্যবসার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পুরোনো কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তবে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিকেল চারটার দিকে পুলিশ মরদেহ তিনটি ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের বিশেষ দল কাজ করছে এবং দ্রুত তথ্য পাওয়ার আশা করছেন পুলিশ কমিশনার।