এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এক আত্মীয় জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ে এই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (গোল্ডেন) পেয়েছে। তিনি বলেন, মূলত সব বিষয়ে এ-প্লাস পেলে নাকি “গোল্ডেন জিপিএ” বলা হচ্ছে, যদিও প্রচলিত জিপিএ গ্রেডিং পদ্ধতিতে ‘গোল্ডেন’ শব্দটি নেই। তবে কারা, কবে থেকে জিপিএ-৫-এর সঙ্গে ‘গোল্ডেন’ শব্দটি যোগ করতে শুরু করেছে, সেই তথ্য তাঁর জানা নেই।
গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েও সেই আত্মীয় ও তাঁর পরিবার স্বস্তিতে নেই। মেয়েটি দীর্ঘ সময় কান্নাকাটি করছে, কারণ তাঁর বন্ধুরা তাঁর চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, সব বিষয়ে লেটার গ্রেড দেওয়ার পাশাপাশি এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় নম্বর যুক্ত করা শুরু করেছে। ফলে এই নম্বরই নাকি ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার উপাদান হয়ে উঠছে।
এ ঘটনাটি শোনার পর লেখক স্তম্ভিত। তাঁর মতে, নম্বরের এই খপ্পরে কেবল ওই আত্মীয়ের পরিবারই নয়, দেশের হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে—পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর—একধরনের মানসিক পীড়ার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে ‘নম্বর’ প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্য জিপিএ বা গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ চালু করা হয়েছিল, সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে উজ্জীবিত করার জন্য ঠিক কবে থেকে আবার আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় নম্বর প্রকাশের ব্যবস্থা চালু করেছে, তা তাঁর জানা নেই।
লেখক বলেন, দুই দশক আগে—যখন জিপিএ-পদ্ধতিতে স্কুল-কলেজ পাস হতো—তখন এই নম্বর প্রকাশের পদ্ধতি চালু ছিল না। এমনকি ‘গোল্ডেন’ নামকরণও ছিল না। জিপিএ-৫ স্কেলে জিপিএ-৫ মানেই ছিল সর্বোচ্চ ফলাফল—আর কোনো প্রশ্ন ছিল না, আর কোনো তুলনাও ছিল না। তাঁর ভাষায়, এটাই ছিল জিপিএ-পদ্ধতির সৌন্দর্য।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, প্রায় দুই শ বছর আগে, ১৭৯২ সালে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ফলাফল মূল্যায়নের জন্য একটি সংখ্যাভিত্তিক পদ্ধতি চালু করেছিলেন উইলিয়াম ফ্যারিশ। পরবর্তী সময়ে জিপিএ-৪ স্কেলে ১৮১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় তা অনুসরণ করতে শুরু করে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ আমাদের অনেক আগে থেকেই এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হলেও, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নম্বরভিত্তিক তীব্র প্রতিযোগিতা কমানো এবং সামগ্রিক মূল্যায়নে জোর দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পুরোনো বিভাগ পদ্ধতি (প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয়) বাতিল করে গ্রেডিং পদ্ধতি (জিপিএ) চালু করে। এতে ৫.০০ স্কেলে এ-প্লাস থেকে এফ পর্যন্ত গ্রেড দেওয়া হয়।
সরকারের বোধগম্য হওয়া জরুরি যে জিপিএ ও নম্বর একসঙ্গে প্রকাশের ফলে যে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হচ্ছে, তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে সন্তান সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেও নিজেকে ব্যর্থ মনে করছে, সেই ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
লেখকের মতে, জিপিএ বা গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ পদ্ধতি মূলত শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত প্রকৃত নম্বরকে একটি নির্দিষ্ট গ্রেডের আওতায় আনে। যেমন, ৮০ থেকে ১০০ নম্বর পেলে এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ বলা হচ্ছে, ৭০ থেকে ৭৯ নম্বর পেলে ‘এ’ এবং জিপিএ-৪—এভাবে ধাপে ধাপে গ্রেড নির্ধারিত হয়।
তিনি বলেন, এই পদ্ধতির বড় সুবিধা ছিল—একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে ৮০ পেলেন নাকি ৯৯ পেলেন, তা গণনার মধ্যে পড়ত না। কারণ, ৮০ থেকে ১০০ পর্যন্ত নম্বরপ্রাপ্তদের এ-প্লাস দেওয়া হয়; ফলে উভয়েই সমানভাবে সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনকারী হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁর মতে, এটাই ছিল জিপিএর মূল দর্শন।
তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় উল্টো পথে হাঁটছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন গড়ে ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছে, আরেকজন পেয়েছে ৮৩ শতাংশ। কিন্তু ৮০-এর ওপর নম্বর—এই একই অবস্থানে থাকায় গ্রেড পদ্ধতি অনুযায়ী দুজনেই জিপিএ-৫ পাচ্ছেন। জিপিএ কার্ডে তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু যখন প্রকৃত নম্বর প্রকাশ পায়, তখন সবাই জানতে পারে—বাস্তব পারফরম্যান্সে পার্থক্য আছে।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর, তাঁর মতে, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের মধ্যে জিপিএর গুরুত্ব কমে গিয়ে নম্বরের গুরুত্ব বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পারিবারিক আলোচনায় ‘কে কত নম্বর পেয়েছে’—এই প্রশ্নই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জিপিএর প্রকৃত দর্শন ব্যর্থতার দিকে গেলে শিক্ষার এই ফলাফল-পদ্ধতির মান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জেনে হোক বা না জেনে—শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ফলাফল নিয়ে একধরনের ‘দ্বিচারিতা’ করছে বলে তাঁর মনে হয়।
লেখক প্রশ্ন রাখেন—একজন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করলে এই পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু থাকে। তাঁর ভাষায়, ফলাফল-ঘোষণা যে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও দৈহিক অবসাদ তৈরি করে, সেই নিয়ম কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও, বিষয়ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ নম্বরসহ মার্কশিট প্রকাশ শুরু হলে, মৌলিক প্রশ্ন ওঠে—জিপিএ কি শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা ও পরিশ্রমের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না? নাকি নম্বরের কাছে জিপিএর গুরুত্ব ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে?
তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের গ্রেডের পাশাপাশি নম্বর দেওয়ার যৌক্তিকতা কী—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়—এ বিষয়টি স্বীকার করা দরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি মনে করে, কেবল জিপিএ দিয়ে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা পূরণ হচ্ছে না—বিশেষ করে একাদশে ভর্তিপ্রক্রিয়া, বৃত্তি নির্ধারণ কিংবা মেধাক্রম তৈরির ক্ষেত্রে যখন একাধিক শিক্ষার্থীর জিপিএ সমান হয়ে যায়—তাহলে সমস্যা দূর করতে অন্যান্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে বলে লেখক মত দেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান মেধাবৃত্তি দেবে; বৃত্তির সংখ্যা ১০০, আবেদনকারী ১৫০—এবং সবাই গোল্ডেন জিপিএ-৫—তাহলে সমাধান হিসেবে শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তাতেও সমতা থেকে গেলে শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তাঁর যুক্তি, এমনও শিক্ষার্থী আছে যারা কেবল জিপিএ-৫ পায়, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের ভেতরে ঠিক কী লেখা আছে—তা নোট-নির্ভর পড়াশোনার কারণে অনেকেই বই খুলে দেখে না।
কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে পছন্দক্রম, বসবাসের এলাকার বাসিন্দা হওয়া কিংবা বিষয়ভিত্তিক গ্রেড বিবেচনার সম্ভাবনাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব বিকল্প পথ অবলম্বন না করে নম্বরভিত্তিক প্রতিযোগিতা চালু রাখা মানে সেই পুরোনো সমস্যাকেই আবার সামনে আনা, যে সমস্যা দূর করার জন্য একদা জিপিএ পদ্ধতি চালু হয়েছিল। তিনি বলেন, দৃশ্যমান অতিরিক্ত মানসিক চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে। জিপিএ-৫-এর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন পুরোনো নম্বরভিত্তিক সেকেলে পদ্ধতিই আবার সরাসরি চালু করছে না—এ প্রশ্নও তাঁর।
লেখক আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফলাফলে কেন নম্বর ফিরছে না? অন্তত সেক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা জানতে পারতেন, তাঁরা ঠিক কোন পদ্ধতিতে মূল্যায়িত হচ্ছেন। জিপিএ ও নম্বর—দুই পদ্ধতির মিশ্রণ শিক্ষার্থীদের সামনে অস্পষ্টতা তৈরি করছে বলেও তাঁর মন্তব্য। তাঁর ভাষায়, তাঁরা বুঝতে পারছেন না—জিপিএ দিয়ে বিচার হবে, নাকি নম্বর দিয়ে।
তিনি পুনরায় জোর দেন—জিপিএ ও নম্বর একসঙ্গে প্রকাশের ফলে যে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হয়, তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর মতে, সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেও যে শিক্ষার্থী নিজেকে ব্যর্থ মনে করে, সেই ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, হয় সরকারকে সম্পূর্ণভাবে জিপিএ পদ্ধতিতে ফিরে গিয়ে নম্বর প্রকাশ বন্ধ করতে হবে, নয়তো নম্বরভিত্তিক পদ্ধতিতেই পুরোপুরি ফিরে গিয়ে জিপিএর ধারণা বাদ দিতে হবে। দুটোকে মিশিয়ে রাখলে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপই বাড়বে—প্রকৃত মূল্যায়নের কোনো উপকার হবে না। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেলেও বন্ধুর চেয়ে কম নম্বর পাওয়ার কারণে কাঁদতে না হয়।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
ই–মেইল: [email protected]মতামত লেখকের নিজস্ব