বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বিরিয়ানি, পোলাও, জর্দা ও মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারে সুগন্ধ বাড়াতে ব্যবহৃত গোলাপজল ও কেওড়াজল নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাজারে থাকা কিছু পণ্যের গায়ে ‘খাদ্যোপযোগী’ বা ‘ফুড গ্রেড’ লেখা থাকলেও সেগুলো তৈরিতে কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
বিএফএসএ বলছে, খাদ্যে ব্যবহারযোগ্য নয় এবং কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত রাসায়নিক দিয়েই এসব সুগন্ধি তৈরির তথ্য তারা পেয়েছে। তাই যথাযথ লেবেলিং ও অনুমোদন ছাড়া গোলাপজল ও কেওড়াজল খাবারে ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটি আরও জানায়, বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু পণ্যে ভেজিটেরিয়ান খাবারের জন্য সবুজ চিহ্নও থাকতে পারে। তবে ওই পণ্যের উপাদান হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘বিশুদ্ধ পানি’ ও ‘গোলাপ ফ্লেভার’ বা ‘কেওড়া ফ্লেভার’ উল্লেখ থাকে। এতে সুগন্ধিটি কোন উপাদান দিয়ে তৈরি হয়েছে এবং তা খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগী কি না—সে বিষয়ে ভোক্তার জানার সুযোগ থাকে না।
অভিযানে যা পাওয়া গেছে
বিএফএসএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রাজধানীর মিটফোর্ডে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। সেখানে গোলাপজল ও কেওড়াজল তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের ফ্লেভার ও রাসায়নিক পাওয়া যায়। কিছু ফ্লেভারের বোতলে ‘ফুড গ্রেড’ লেখা থাকলেও সেগুলো খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগী—এমন কোনো প্রমাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দেখাতে পারেনি।
পরে ওই প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা রাসায়নিক ও ফ্লেভারের উৎস খুঁজতে আরেকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। সেখানে মজুত করা কিছু ফ্লেভার ও রাসায়নিক ‘সিনথেটিক গ্রেড’ হিসেবে শনাক্ত হয়, যা খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগী নয় বলে কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে রাজধানীর ডেমরার বাঁশেরপুল এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে কেওড়াজল, গোলাপজল ও অন্যান্য ফ্লেভার তৈরির তথ্য পায় বিএফএসএ। হাইকো কনজ্যুমার প্রোডাক্টস নামের ওই প্রতিষ্ঠানকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক জব্দ এবং উৎপাদিত কেওড়াজল বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানায় বিএফএসএ।
লেবেল নিয়েও আপত্তি
বিএফএসএর আপত্তি শুধু ব্যবহৃত রাসায়নিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পণ্যের লেবেলিংয়েও রয়েছে। মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০১৭ অনুযায়ী, খাদ্যে ব্যবহারযোগ্য সুগন্ধির ক্ষেত্রে ‘অনুমোদিত প্রাকৃতিক’, ‘অনুমোদিত কৃত্রিম’ অথবা ‘অনুমোদিত প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম’—এ ধরনের অভিব্যক্তি থাকার কথা। কৃত্রিম সুগন্ধির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সুগন্ধি দ্রব্যের সাধারণ নাম এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ইনডেক্স বা আইএনএস নম্বরও উল্লেখ করতে হবে।
বাজারের কিছু পণ্যের লেবেলে শুধু পানি ও ফ্লেভারের কথা থাকায় ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন বা উৎস সম্পর্কে ভোক্তার জানার সুযোগ নেই বলে জানায় বিএফএসএ। আবার কোনো কোনো পণ্যে ‘ফুড গ্রেড’ লেখা থাকলেও তার পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে যথাযথ লেবেলিং ছাড়া এ ধরনের সুগন্ধি খাবারে ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছে বিএফএসএ। রেস্টুরেন্ট, বেকারি, কমিউনিটি সেন্টার, ক্যাটারিং সার্ভিসসহ খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে বিএফএসএ বলছে, বাজারে থাকা সব গোলাপজল বা কেওড়াজল নিষিদ্ধ নয়। খাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত এবং নির্ধারিত তথ্য যথাযথভাবে লেবেলে উল্লেখ থাকা পণ্য এই সতর্কতার আওতায় পড়বে না। অননুমোদিত, ভুল বা বিভ্রান্তিকর লেবেলযুক্ত এবং খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগিতা প্রমাণিত নয়—এমন সুগন্ধি ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
কেন সতর্কতা
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইন ও নীতি বিভাগের সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার মুক্তকণ্ঠকে জানান, বিভিন্ন খাবারে গোলাপজল ও কেওড়াজল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পোলাও এবং কাচ্চি বিরিয়ানির মতো খাবারগুলোতে সুগন্ধি হিসেবে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। অনেক সময় বিয়েবাড়ি বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে বাবুর্চিরা অসচেতনতাবশত রান্নায় এই রাসায়নিকগুলো ব্যবহার করে থাকেন।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ ভোক্তারা কেওড়াজলকে প্রাকৃতিক বা ভেষজ (হারবাল) মনে করলেও এগুলো মূলত আমদানি করা রাসায়নিক (কেমিক্যাল) দিয়ে তৈরি করা হয়। এই রাসায়নিকগুলোর খাদ্যে ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ল্যাব টেস্ট বা গবেষণার তথ্য আমাদের কাছে নেই; মূলত মাঠপর্যায়ের মনিটরিং ও অভিযোগের ভিত্তিতেই আমরা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের মনিটরিং টিম মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে কিডনি ডায়ালাইসিসের ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে কেওড়াজল, গোলাপজল ও অন্যান্য ফ্লেভার পণ্য বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে উৎপাদন করতে দেখতে পায়। তখন সেই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়।’
উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বোতলের গায়ে পণ্যটিকে ‘খাদ্যোপযোগী’ (ফুড গ্রেড) হিসেবে দাবি করায়, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘তা সত্ত্বেও, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন দোকান থেকে এই ধরনের অনুমোদনহীন রাসায়নিক জব্দ করে ধ্বংস করেছি।’
মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আরও বলেন, ‘তদন্তের অংশ হিসেবে আমরা যখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে পরিদর্শনে যাই, তখন তারা জানায় যে তারা এগুলো খাদ্যে ব্যবহারের জন্য তৈরি করে না। সাধারণত গোলাপজল ধর্মীয় আচার বা মৃতদেহে ছিটানোর কাজে দেশজুড়ে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যখন কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্যের গায়ে “নন-ফুড গ্রেড” বা “খাদ্যোপযোগী নয়” লিখে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তারা সেটি লিখতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা জানায়, এটি খাদ্যের জন্য তৈরি করা হচ্ছে না। তাদের কথারও যৌক্তিকতা আছে। এখন ভোক্তারা এটিকে খাবারে ব্যবহার করলে দায়িত্ব তাদেরই।’
গণসচেতনতা তৈরির চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এ বিষয়ে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি করা। হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি আমাদের মনিটরিং টিম নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া কমিউনিটি সেন্টার ও বিয়েবাড়ির বাবুর্চিদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার একটি বিশেষ পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে, যেন রান্নায় এই ক্ষতিকর উপাদানগুলোর ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়।’
আইনে শাস্তির বিধান
বিএফএসএ জানিয়েছে, খাদ্যে অননুমোদিত খাদ্য সংযোজন দ্রব্য ব্যবহার এবং যথাযথভাবে লেবেলিং না করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ২৭ ও ৩২ ধারার অধীনে অপরাধ। তাই পণ্যের গায়ে শুধু ‘ফুড গ্রেড’ বা ‘খাদ্যোপযোগী’ লেখা থাকলেই সেটিকে খাদ্যে ব্যবহারের অনুমোদিত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। পণ্যের উপাদান, ব্যবহৃত সুগন্ধির ধরন এবং নির্ধারিত লেবেলিংয়ের শর্ত পূরণ করতে হবে।
ভোক্তাদের করণীয়
কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে যথাযথ লেবেলিং ছাড়া গোলাপজল, কেওড়াজল বা এ ধরনের কোনো সুগন্ধি খাবারে ব্যবহার কিংবা কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। পণ্য কেনার আগে সেটি খাদ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কি না, কী ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়েছে এবং লেবেলে প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ আছে কি না—তা দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিএফএসএ। খাবারে সুগন্ধ বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত কোনো পণ্য শুধু ‘গোলাপজল’ বা ‘কেওড়াজল’ নামেই নিরাপদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পণ্যটি কী দিয়ে তৈরি, খাদ্যে ব্যবহারের অনুমোদন আছে কি না এবং লেবেলে প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে কি না—এসব যাচাই করেই তা খাবারে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে বিএফএসএ।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে গোলাপজল ও কেওড়াজল আমাদের দেশে বিরিয়ানিতে ও মাংসের রেজালাতে দিতে দেখে আসছি। এখন এটিতে যদি অসংগতি পাওয়া যায়, আর প্রস্তুতকারকেরা যদি বলে থাকে যে এটা আমরা খাওয়ার জন্য তৈরি করিনি, তাহলে ওই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এটা করতে বাধ্য করা উচিত যে আপনারা এটা লেবেলে দেন, কারণ যেহেতু খাওয়ার জন্য তৈরি করিনি বলছেন। উনারা যেহেতু বলছেন, তাহলে অবশ্যই লেবেলিংয়ে তা উল্লেখ থাকা উচিত। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চাইলেই কিন্তু বাধ্য করতে পারে। সেই সেই ক্ষমতা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনে আছে।’
তিনি বলেন, ‘গোলাপজল ও কেওড়াজল খাদ্যে ব্যবহার করা যাবে কি না বা নিরাপদ নয়—এমন প্রশ্ন যেহেতু উঠেছে, সেহেতু এটি নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থান, উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এটির নমুনা সংগ্রহ করে এটি নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তাহলে এটি নিয়ে ভোক্তাদের আরও সতর্ক করা যাবে।’