এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল কেবল উদ্বেগ তৈরি করছে না—এটি শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব অবস্থারও একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে প্রায় ১৯ হাজার। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু এসএসসিতে পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—যেখানে রাষ্ট্র ও পরিবার উভয়েরই বিনিয়োগ থাকে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে, সেখানে অর্জনের ব্যবধান এত বড় কেন। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর পাস করতে না পারার বিষয়টি তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সরকার—সবার জন্যই হতাশার।
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, ফলাফলই যেন তার সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেছেন, ‘এবারের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে এসএসসি, এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল শুধু কতজন পাস করল, কতজন ফেল করল কিংবা উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয় নয়। এই ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক গলদ ও বাস্তব চিত্রের দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়ার জরুরি তাগিদ দিচ্ছে।’
ফল বিপর্যয়ের পেছনে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা ভূমিকা রেখেছে বলে মূল্যায়ন থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মানবিক শাখার শিক্ষার্থীরাও বিজ্ঞান ও বাণিজ্য থেকে খারাপ ফল করেছে। দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বোর্ডের পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর তুলনায় বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড অনেক পিছিয়ে। এ বছর একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে, যার অধিকাংশই প্রান্তিক অঞ্চলের।
এই চিত্র শুধু শিক্ষাব্যবস্থার গলদকেই নয়, বৈষম্যমূলক বাস্তবতাকেও সামনে আনে। করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের শিখনঘাটতি বেড়ে উঠছে। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে শিখনঘাটতি কমাতে বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিজ্ঞতা বলছে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরা চলা রাজনৈতিক অস্থিরতাও শিখনঘাটতির একটি বড় কারণ।
তবে মাধ্যমিক শিক্ষায় শহরাঞ্চলের তুলনায় মফস্সলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ হিসেবে শিক্ষকের ঘাটতির কথাই বেশি করে উঠে আসে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় ইংরেজি, গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না—ফলে শিখনঘাটতি তৈরি হয়। পাশাপাশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাকে অনেক ক্ষেত্রে কোচিং, গাইড বই ও প্রাইভেট টিউশননির্ভর করে তোলার প্রবণতাও শহর ও গ্রামে বৈষম্য বাড়াচ্ছে।
আমরা মনে করি, শিখনঘাটতি, শিক্ষকের ঘাটতি এবং বৈষম্যের মতো গুরুতর প্রশ্নগুলো সমাধান না করে শুধু পাস-ফেলের হিসাব দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যাবে না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী যথার্থই বলেছেন, ‘যথাস্থানে যথাযথ বিনিয়োগ ছাড়া শুধু মূল্যায়ন কড়াকড়ি বা বস্তুনিষ্ঠ করলেই শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে না।’
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যারা কৃতকার্য হয়েছে, তাদের সবাইকে আমাদের অভিনন্দন। যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের কোনোভাবেই ভেঙে পড়া যাবে না। ফেল করা শিক্ষার্থীদের প্রতি অভিভাবক, পাড়া-প্রতিবেশী ও শিক্ষকদের সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীরা কেন, কোথায় পিছিয়ে পড়েছে এবং শিখনঘাটতি কাটিয়ে ওঠার পথ কী—এসব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্ররা খারাপ ফল করেছে। ছাত্ররা কেন ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল করছে—তার অনুসন্ধানও সমানভাবে প্রয়োজন। সর্বোপরি, সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েই গভীর বিশ্লেষণ দরকার।