জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ৭.৬২ এমএম গুলি ব্যবহার করেছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আজ মঙ্গলবার প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম এই তথ্য জানান।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আজ পঞ্চম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার।
যুক্তিতর্কে তিনি জানান, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত একটি প্রতিবেদন প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে পুলিশ মোট ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১টি গুলি ব্যবহার করেছে, যার একটি বড় অংশ ছিল ৭.৬২ এমএম গুলি। প্রসিকিউটর আরও উল্লেখ করেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় ৪০টি জেলায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং শুধুমাত্র ঢাকাতেই পুলিশের ছোড়া গুলির সংখ্যা ছিল ৯৫ হাজারের বেশি।
আদালতের কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, "পুলিশ সদর দপ্তর তাঁদের যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখান থেকে যুক্তিতর্কে তাঁরা দেখিয়েছেন যে ৭.৬২ এমএম গোলাবারুদ, যেটা সাধারণত সেনাবাহিনী ব্যবহার করে, সেটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ব্যবহার করেছিল।"
বেসামরিক ব্যক্তির পক্ষে ৭.৬২ এমএম গুলি কেনা বা পাওয়া অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "জাতিসংঘ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, তারা বেশ কিছু হাসপাতালে গিয়েছে। যেসব চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ রোগীদের চিকিৎসা করেছিলেন, তাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছে। সেখান থেকে জাতিসংঘ দেখতে পেয়েছে, এই আন্দোলনে একটা বিশালসংখ্যক ৭.৬২ এমএম গুলি নিহতদের শরীরে ছিল।"
মামলায় একজন অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা ও গোলাবারুদ-বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, আধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি-অটোমেটিক) ৭.৬২ এমএম চায়নিজ রাইফেলের গুলি ৩০০ মিটারের মধ্যে কারও শরীরে লাগলে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম যুক্তিতর্কে বলেন, ছাত্রলীগকে নিষেধ করেও থামানো যেত না। সেখানে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘পেটাও না কেন ওদের, মারও না কেন।’ এর ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার উল্লেখ করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ)। ওবায়দুল কাদেরের উসকানির পর ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। এমনকি আহত শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেও সেখানে তাদের মারধর করা হয়। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের হামলার নিকৃষ্টতম দিক হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
মামলার আসামিদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের ছাড়াও রয়েছেন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। মামলার সব আসামি বর্তমানে পলাতক।